সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে ভারতে যাত্রা শুরু করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবার রাজপথে নেমেছে। জাতীয় পর্যায়ের ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নফাঁস এবং অনিয়মের প্রতিবাদে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন আন্দোলনকারীরা।
গত শনিবার থেকে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আন্দোলনকারীদের এমন শক্ত অবস্থানের কারনে বিপাকে পড়েছে বিজেপি সরকার ও মোদি প্রশাসন।
সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৩০ বছর বয়সী বোস্টন ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে বলেন, যত দিনই লাগুক, আমরা এখানেই থাকব। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
মাত্র এক মাস আগে গঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের ব্যঙ্গাত্মক রূপ। দলটির প্রতীক ‘তেলাপোকা’ বেছে নেওয়া হয়েছে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, যা অনেকের মতে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং উচ্চ বেকারত্বে হতাশ তরুণদের ক্ষোভই এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর।
প্রতিদিন শত শত মানুষ পোস্টার, স্লোগান ও দেশাত্মবোধক গান নিয়ে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে অনেক বিক্ষোভকারী দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের গোলাপ ফুল উপহার দিচ্ছেন। অনেকে জাতীয় পতাকা ও সংবিধানের কপি হাতে নিয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
আন্দোলনে প্রতিদিনই থাকছে প্রতীকী কর্মসূচি। একদিন বিক্ষোভকারীরা থালা-বাসন বাজিয়ে কোভিড-১৯ মহামারির সময় মোদির আহ্বানের প্রতি ব্যঙ্গাত্মক ইঙ্গিত দেন। আবার মঙ্গলবার অংশগ্রহণকারীদের ডায়াপার নিয়ে এসে তাতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি লেখার আহ্বান জানানো হয়। অভিজিৎ দীপকের ভাষায়, ভারতে এমন কোনো সরকারি পরীক্ষা নেই, যেখানে প্রশ্নফাঁস হয় না। তাই ডায়াপার ছিল প্রশ্নফাঁস ঠেকানোর প্রতীকী বার্তা।
ভারতের উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির জন্য অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী অংশ নেন। সীমিত সংখ্যক আসনের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার এই ব্যবস্থায় সামান্য নম্বরের ব্যবধানই একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির অভিযোগে বিতর্কের মুখে রয়েছে এই পরীক্ষা ব্যবস্থা।
গত মাসে ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ফলাফল প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বাতিল করা হয়। এরপর পরীক্ষার চাপ ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ ওঠা একাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আন্দোলনকারীরা মোমবাতি প্রজ্বালন করে শ্রদ্ধা জানান।
এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেন। তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে অভিজিৎ দীপকে বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার চাওয়ার পরিবর্তে আমাদের সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে। নৈতিক দায় স্বীকার না করে এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক।
পরীক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদারে সম্প্রতি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার পুনঃপরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরিবহনে সামরিক বিমান ব্যবহার এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনস্থলে প্রতিদিন স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসছেন। দিনের বেলায় ২০০ থেকে ৩০০ জন এবং সন্ধ্যার পর প্রায় ৫০০ জন পর্যন্ত বিক্ষোভকারী সেখানে অবস্থান করছেন। রাতে প্রায় ৫০ জন আন্দোলনকারী যন্তর মন্তরেই অবস্থান করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অভিজিৎ দীপকে জানান, আন্দোলন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
সূত্র: সিএনএন
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


