আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এবার চাঁদের বুকে ইলন মাস্কের 'শহর', আসলেই কি সম্ভব

আমার দেশ অনলাইন

এবার চাঁদের বুকে ইলন মাস্কের 'শহর', আসলেই কি সম্ভব

এক্স (সাবেক টুইটার), টেসলা আর স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এই ব্যক্তি তার সাম্প্রতিক এক এক্স পোস্টে লিখেছেন, মঙ্গল গ্রহে শহর নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে চাঁদে শহর গড়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছে স্পেসএক্স।

চাঁদে গড়ে তোলা যেতে পারে 'স্ববর্ধনশীল শহর' এবং এটা ১০ বছরেরও কম সময়ে সম্ভব— এমন পরিকল্পনার কথাই জানিয়েছেন ইলন মাস্ক।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলের বদলে চাঁদ

'স্ববর্ধনশীল' শহর নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ নকশা বা বিশদ পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। বরং এখন পর্যন্ত তা ইলন মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করা পরিকল্পনার পর্যায়েই আছে। চাঁদের সম্পদ ব্যবহার করে ধীরে ধীরে স্থায়ী মানব বসতি স্থাপন ও তা সম্প্রসারণের কথা বলছেন মাস্ক। আর তা সম্ভব হবে চাঁদে আরও ঘন ঘন উৎক্ষেপণের মাধ্যমে।

নিজের পোস্টে মাস্ক লিখেছেন, এটি ১০ বছরেরও কম সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যেখানে মঙ্গল গ্রহে একই কাজ করতে ২০ বছরের বেশি সময় লাগবে।

স্পেসএক্সের মিশন একই রয়েছে: আমরা যেমনটা জানি তেমন চেতনা ও জীবনকে নক্ষত্রের দিকে সম্প্রসারিত করা।

মাস্ক ব্যাখ্যা করেছেন, প্রতি ২৬ মাসে (ছয় মাসের ভ্রমণ সময়) গ্রহগুলোর অবস্থান অনুকূলে এলেই কেবল মঙ্গল গ্রহে যাত্রা সম্ভব।

অন্যদিকে, আমরা প্রতি ১০ দিন অন্তর চাঁদের উদ্দেশে উৎক্ষেপণ করতে পারি (দুই দিনের ভ্রমণ সময়)। এর অর্থ হলো, মঙ্গলের তুলনায় চাঁদে শহর নির্মাণের কাজ আমরা অনেক দ্রুত সম্পন্ন করতে পারব।

বৈদ্যুতিক গাড়ি ও স্বয়ংচালিত প্রযুক্তির মতো প্রকল্পে উচ্চাভিলাষী সময়সীমা নির্ধারণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে মাস্কের, যার অনেকগুলোই নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়নি।

যেভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে

যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশ বিষয়ক বিভাগ স্পেস অ্যাপ্লিকেশন্স, এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড ইন্সট্রুমেন্টেশনের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. সাংউ লিমের মতে, স্পেসএক্সের চাঁদে ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা 'উচ্চাভিলাষী' হলেও 'বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি' নয়।

মূল ধারণা হলো, চাঁদের মাটি ব্যবহার করে অক্সিজেন, পানি ও নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করা, যা পৃথিবীর শিল্প প্রক্রিয়ায় আমরা ইতোমধ্যে করছি। তাত্ত্বিকভাবে এটি করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

ড. লিমের মতে, বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাঁদের তীব্র তাপমাত্রা, সূক্ষ্ম ধূলিকণা, স্বল্প মাধ্যাকর্ষণ এবং সীমিত শক্তি সরবরাহের মতো কঠোর পরিবেশে নির্ভরযোগ্যভাবে এসব ব্যবস্থার কাজ করতে পারা।

আমাদের এগুলোর ওপর নির্ভর করার আগে চাঁদের পৃষ্ঠে সেগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন, যোগ করেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলো সাধারণত সতর্কভাবে এগোয়, কারণ তারা জনঅর্থায়ন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক চক্রের ওপর নির্ভরশীল।

যার ফলে নতুন ধারণা দ্রুত পরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত থাকে। তার ভাষায়, স্পেসএক্স আলাদাভাবে পরিচালিত হয়। তাদের নতুন রকেট ব্যবস্থা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে, তারা আরও ঘন ঘন এবং কম খরচে চাঁদে সরঞ্জাম পাঠাতে পারবে, যা অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অ্যারোনটিক্স ও অ্যাস্ট্রোনটিক্সের অধ্যাপক এবং সাবেক নাসা নভোচারী জেফরি হফম্যান মনে করেন, স্পেসএক্স এবং অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মহাকাশ প্রযুক্তি কোম্পানি ব্লু অরিজিন যদি সফলভাবে চাঁদে অবতরণের যান তৈরি করতে পারে, তবে আমরা এখনই একটি চন্দ্রঘাঁটির জন্য লজিস্টিক সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারি।

কিন্তু মঙ্গল অভিযান এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য, বলেন তিনি। তবে অধ্যাপক হফম্যানের মতে, টেকসই চন্দ্র আবাসন নির্মাণ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে মঙ্গলে ঘাঁটি স্থাপনের সময় প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ড. গুভেনও এতে একমত। তার ভাষায়, একবার চাঁদে ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হলে মঙ্গলে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়ে যাবে। কারণ চাঁদকে তখন 'সোপান' বা মধ্যবর্তী জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা

মাস্কের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন চলতি দশকের মধ্যেই মানুষকে আবার চাঁদে পাঠানো নিয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭২ সালে নাসার অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর থেকে চাঁদের বুকে আর কেউ পা রাখেনি।

সম্প্রতি একটি চুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি এক্সএআই-কে স্পেসএক্স-র অধিগ্রহণের কথা ঘোষণা করেছেন ইলন মাস্ক। ওই কোম্পানিটিরও নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন।

চুক্তি অনুযায়ী, রকেট ও স্যাটেলাইট কোম্পানিটির মূল্য ধরা হয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলার আর এআই প্রতিষ্ঠানের মূল্য ২৫০ বিলিয়ন ডলার।

মিশেল ফ্লুরি জানিয়েছেন, এই ঘোষণা মাস্কের মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের উচ্চাভিলাষী চিন্তাকে সমর্থন জোগাতে পারে। কারণ বিপুল পরিমাণ এআই গণনাকাজ পরিচালনার জন্য এসব কেন্দ্র ব্যবহার করা হবে।

স্পেসএক্সের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার মাস্ক সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির আগে তার ব্যবসাগুলোকে পুনর্গঠিত করছেন বলে জানিয়েছেন আমাদের সংবাদদাতা। জানা গেছে, তিনি স্পেসএক্সকে শেয়ারবাজারে আনার কথা ভাবছেন।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার তোলা যেতে পারে, যা ইতিহাসের সম্ভাব্য বৃহত্তম শেয়ারবাজারে প্রাথমিক শেয়ার ছাড় (আইপিও) হতে পারে।

গত মাসে মাস্ক মহাকাশে ১০ লাখ ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এআই-এর ব্যবহার বাড়ার কারণে পৃথিবীর বিদ্যমান ডেটা সেন্টারগুলোর চাহিদাও বাড়ছে। আর তা মেটাতে এই কর্মসূচি সহায়ক হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ এখনও সন্দিহান।

তাদের মতে, মহাশূন্যের শূন্যতায় গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট – জিপিইউ ঠান্ডা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বাতাসের অনুপস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর এআই ও ডেটা-নির্ভর কাজের ক্ষেত্রে জিপিইউ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গত সোমবার এক্সে এক ব্যবহারকারীর জবাবে মাস্ক জানিয়েছেন, চলতি বছরে স্পেসএক্সের আয়ের পাঁচ শতাংশেরও কম নাসা থেকে আসবে। চাঁদে নভোচারী অবতরণ করানোর দায়িত্বে থাকা আর্টেমিস প্রোগ্রাম–এ স্পেসএক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন