বৈশ্বিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লগিরি শেষের পথে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয় বা বহুমেরুত্বের উত্থান বা দেশটির প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ডের কারণে নয়। এটি শেষ হচ্ছে, কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি শেষ করতে চান।
ঘরে-বাইরে ট্রাম্পের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ভিত দ্রুতগতিতে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর অন্যতম সুবিধাভোগী হবেন চীনের নেতা শি জিনপিং। ট্রাম্প বিশ্বকে চীনের হাতে তুলে দিতে ইচ্ছুক বা তিনি বুঝতেই পারছেন না প্রকৃতপক্ষে তিনি এটাই করছেন। বিশ্ব নিয়ে তার দূরদৃষ্টিহীন দৃষ্টিভঙ্গি, স্বৈরাচারীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আত্মপ্রেম একত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি বেশ কাজ করছিল। ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে তিনি মস্কোকে এত দুর্বল করতে সক্ষম হন যে, শেষ পর্যন্ত ভ্লাদিমির পুতিন উত্তর কোরিয়ার সাহায্য নিতে বাধ্য হন। গাজায় হামাসের সঙ্গে লড়াইয়ে ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব খর্ব করেছে। পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জোটবদ্ধ পথচলাকে শক্তিশালী করেছিলেন, যার কারণে হাঁসফাঁস করছিল চীন। প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলতে জিনপিংয়ের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক ছাতার নিচে এসেছিল উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো।
এখন ট্রাম্প স্বেচ্ছায় সেসব কষ্টার্জিত সুবিধা ছুড়ে ফেলছেন। স্বঘোষিত এ মধ্যস্থতাকারী আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনকে উৎসর্গ করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এ ধরনের কোনো মীমাংসার বড় সুবিধাভোগী হবে চীন। কেননা বেইজিং হচ্ছে মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। ফলে পুতিন যদি তার বিপর্যয়কর যুদ্ধ থেকে কোনো লাভ অর্জন করতে পারেন, তাহলে তা নিশ্চিতভাবেই দুই স্বৈরশাসকের বৈশ্বিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নেবে। এজন্য ট্রাম্পকে উত্তেজিত করছেন জিনপিং। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে বেইজিং বারবার ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। তারপর চীনা নির্মাণ কোম্পানিগুলো সেখানে ঢোকার এবং ভঙ্গুর ইউক্রেন পুনর্নির্মাণ করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করবে।
জিনপিং নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পারছেন যে, পুতিনের প্রতি ট্রাম্প আকৃষ্ট হওয়ার ফলে তিনি আটলান্টিক জোট ভেঙে ইউরোপে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। যদিও ইউরোপের নেতারা ভুলে যাননি যে, ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনকে সহায়তা করছেন জিনপিং। কিন্তু ট্রাম্প যদি ইউরোপের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দেন, তাহলে জিনপিং সম্ভবত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনা প্রভাব সম্প্রসারণের সুযোগ নিতে পারেন।
জিনপিং এই যুক্তি দেখাতে পারেন যে, পুতিনের রাশ টেনে ধরতে সক্ষম তিনি। এ ছাড়া তিনি সক্ষম ইউক্রেন ও ইউরোপে স্থিতিশীলতা রক্ষা করতেও। তবে এ প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি হয়তো সাহসী পুতিনকে আটকাতে ইচ্ছুক নন, এমনকি সক্ষমও নন। তবুও ওয়াশিংটন কর্তৃক পরিত্যক্ত ইউরোপীয় নেতারা শান্তি বজায় রাখার জন্য জিনপিংয়ের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
এ ছাড়া ট্রাম্প অন্যান্য সুযোগও অবলীলায় জিনপিংয়ের হাতে তুলে দিচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক শক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য পথ পরিষ্কার হচ্ছে চীনের। ইউএসএআইডি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে চীন উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে আরো অপরিহার্য হয়ে উঠবে। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করতে ট্রাম্পের অদ্ভুত পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে জিনপিংয়ের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হবে, যে অঞ্চলটিকে চীন তার স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। এমনকি বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা স্থগিত করার ফলেও লাভ হচ্ছে বেইজিংয়ের। কেননা এ খাতে আধিপত্য বিস্তার করতে উন্মুখ হয়ে আছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়সংকোচনকে তাইওয়ানে তার স্বার্থরক্ষায় আরো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার আমন্ত্রণ হিসেবে দেখতে পারে চীন। বেইজিং এমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে পারে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনসহ এশিয়ার অন্যান্য মার্কিন মিত্রের প্রতিও।
ট্রাম্প হয়তো ভাবতে পারেন শুল্ক আরোপ করে জিনপিংকে তিনি দমিয়ে রাখতে পারবেন। সম্প্রতি চীনের ওপর শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এতে খুব একটা চিন্তিত মনে হয়নি জিনপিংকে। বেইজিংও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে; তবে তা গুরুতর নয়। পুরো বিশ্ব দখলে নেওয়ার সুযোগ যেখানে এসেছে চীনের সামনে, সেখানে সামান্য শুল্ক নিয়ে উচ্চবাচ্য করে কী লাভ!
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানের ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে। এখন আশা করা যায় ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান গণতান্ত্রিক দেশগুলো ট্রাম্প যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করছেন, সেটি যেন চীন পূরণ করতে না পারে— সে পদক্ষেপ নেবে। পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্প ইউক্রেন নিয়ে কী চুক্তি করেন, তা মানতে ইউরোপীয় নেতারা বাধ্য নন। তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এবং ওয়াশিংটনে নতুন প্রশাসন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে সক্ষম। যদিও এ পথ ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা যুক্তরাষ্ট্র ফের বিশ্বনেতা হয়ে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। এ অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের চীনের সঙ্গে যথাসাধ্য আপস করতে বাধ্য করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো পুতিনের সঙ্গে বিষয়গুলো মিটিয়ে নিতে চাইছে, যাতে চীনের মোকাবিলায় সীমিত মার্কিন সম্পদকে কেন্দ্রীভূত করা যায়। কিন্তু এই পথটি কেবল চীনের সঙ্গে লড়াই করা আরো কঠিন করে তুলতে পারে; কারণ আমেরিকা তার মিত্রদের পাশে না রেখেই তা করতে বাধ্য হবে।
বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। ট্রাম্প হয়তো মনে করেন, ইউরোপ ও এশিয়ায় যা ঘটে, তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি হয়তো ঠিকই বলছেন, অন্য শক্তিধর দেশগুলোর উচিত তাদের নিজস্ব বিষয়গুলো দেখভালের জন্য আরো বেশি কিছু করা। কিন্তু আমেরিকানরা সবার মতোই জানে যে, বিশ্বের দূরদূরান্তে যা ঘটে, তা ১৯৩০ এবং ৪০-এর দশকে ইউরোপে হোক বা একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফগানিস্তানে— তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং প্রায়ই তা করে, এমনকি এমন সংঘাতের দিকেও টেনে নিয়ে যায়, যেখানে তারা লড়াই করতে চায় না। এর অর্থ এই নয় যে, ওয়াশিংটনকে প্রতিটি বিরোধের ওপর নজরদারি করতে হবে। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী চীনের হাতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব তুলে দিয়ে ট্রাম্প এমন একটি বিশ্ব তৈরি করছেন, যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্র, এর সমৃদ্ধি এবং জনগণের প্রতি প্রতিকূল হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

