শিশুদের নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি অঙ্গরাজ্য, ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া ও বিভিন্ন মার্কিন অঞ্চলের সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটা। তবে এই সমঝোতার পরও প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যবসায়িক মডেলের মূল কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এড়িয়ে গেছে।
গত সপ্তাহে হওয়া এই সমঝোতার আওতায় শিশুদের নিরাপত্তা বাড়াতে মেটাকে বেশ কিছু নতুন ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে ব্যবহারকারীদের জন্য ডিফল্ট সুবিধা, অভিভাবকদের ব্যক্তিগতকৃত ফিড নিয়ন্ত্রণের সুযোগ, দৈনিক স্ক্রিন-টাইম সীমা এবং শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত কিছু ফিচার—যেমন কসমেটিক সার্জারি বা চেহারা পরিবর্তনের ফিল্টার—নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।
সমঝোতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো মেটার অ্যালগরিদমনির্ভর ব্যবসায়িক কাঠামো কার্যত অক্ষত থাকছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখার জন্য যে নকশা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়, সেটিই শিশু ও কিশোরদের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতির অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সমঝোতায় সেই মূল ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
সমঝোতার মাধ্যমে মেটা কোনো দায় স্বীকারও করেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতে যে প্রশ্নগুলো উঠছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ পূর্ণাঙ্গভাবে নিষ্পত্তির আগেই মামলা শেষ হয়ে গেল। মামলায় মেটার ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরিসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে সাবেক মেটা নিরাপত্তা প্রকৌশলী আর্তুরো বেহারের মতো হুইসেলব্লোয়ারদের অভিযোগও সামনে এসেছিল।
১৮ বিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি বিশাল হলেও গার্ডিয়ানের মতে, মেটার সামগ্রিক ব্যবসার তুলনায় এর প্রভাব সীমিত। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে—এই পরিমাণের তুলনায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সক্ষমতায় বড় ধাক্কা তৈরি করার মতো নয়। ফলে আর্থিক জরিমানা দিয়ে মেটাকে তার মূল ব্যবসায়িক পদ্ধতি পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অবশ্য মেটা ও অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশ শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা ও অ্যালগরিদমের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর বিধিনিষেধের কথা বিবেচনা করছে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমস্যাটি শুধু শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সহিংসতা, বিভাজনমূলক বক্তব্য ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ছড়িয়ে পড়ার মতো বৃহত্তর সামাজিক ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর শুধু বিচ্ছিন্ন মামলা বা আর্থিক জরিমানার পরিবর্তে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়ে বিগ টেক কোম্পানিগুলোর প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক স্বাধীনতা ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে—মেটার এই সমঝোতা সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। শিশু সুরক্ষায় নতুন পদক্ষেপ স্বাগত হলেও প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর বৃহত্তর সামাজিক প্রভাব মোকাবিলায় আরো কঠোর আইন ও সরকারি নজরদারি প্রয়োজন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

