লাইব্রেরি সহকারি থেকে চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সে তুং

লাইব্রেরি সহকারি থেকে চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সে তুং

কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংকে আধুনিক চীনের অন্যতম রূপকার বলা হয়। অথচ জীবনের শুরুর দিকে তিনি ছিলেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ লাইব্রেরি সহকারী বা গ্রন্থাগার সহকারী।

১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর মধ্য চীনের হুনান প্রদেশে যখন মাও সে তুংয়ের জন্ম হয়, তখন দেশটিতে চিং রাজবংশের শাসন চলছিল। তবে সে সময় দেশজুড়ে বিরাজ করছিল অস্থিরতা ও দুরবস্থা। এই প্রদেশেরই শাওশান এলাকার এক কৃষক পরিবারে মাও সে তুং জন্মগ্রহণ করেন।

বিজ্ঞাপন

অবশেষে ১৯১১ সালে চীনা রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং দেশটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। কিন্তু দুর্বল জাতীয়তাবাদী সরকার এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে দেশটিতে বিভক্তির সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তরুণ লাইব্রেরি সহকারী মাও সে তুং।

মাও সে তুং এবং তার কমিউনিস্ট পার্টি কীভাবে চীনের ক্ষমতায় এসেছিল, সেটিকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘ইতিহাসের এক চমৎকার দুর্ঘটনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

কীভাবে মাও সে তুং আধুনিক চীনের নেতা হয়ে উঠেছিলেন?

চীনে তখন চলছিল কিং রাজবংশের খুবই দুর্দশাগ্রস্ত শাসন। জনগণের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত করুণ। তবে মাওয়ের পরিবার অন্যদের তুলনায় স্বচ্ছল ছিল। ১৯২০ সালের শুরুতে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করার সময়ই মূলত মাও সে তুং মার্ক্সবাদী সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

কারণ চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির দুইজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য—পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গ্রন্থাগারিক লি দাজাও এবং ডিন চান্দু শীলের সঙ্গে সেখানেই তার পরিচয় হয়। তাদের কাছ থেকে মাও মার্ক্সবাদের প্রতি প্রভাবিত হন। মার্ক্সবাদ এবং লেনিনবাদই তার পুরো জীবনকে প্রভাবিত করে।

ওই বছরের শেষের দিকে দেশটি বন্যা, দুর্ভিক্ষ ও সংঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দুর্ভিক্ষের মুখে দেশটির অনেক নাগরিক চীনের মূল ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যান। আর ওই সময় হাজার হাজার মানুষ রোগে ভুগে এবং অনাহারে মারা যায়। এর ফলে চীনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, কৃষকরা নিজেদের সন্তানও বিক্রি করতে বাধ্য হন।

হুনানের সচ্ছল কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মাও সে তুং ২৫ বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার পাঠ চুকান। কিন্তু নিজের শহরে দুর্ভিক্ষের শিকার বিক্ষোভকারীদের হত্যার শৈশবের সেই স্মৃতি তাকে প্রবলভাবে নাড়া দিত।

নিজ দেশের এই কঠিন সময়গুলোই মাও সে তুংকে তার জীবন এবং বিপ্লবী ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব তাকে খুব আকর্ষণ করে।

সে সময়ই কমিউনিজম বা সাম্যবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। এরপরই মাও সে তুং প্রাথমিক লড়াই শুরুর ধাপ হিসেবে কৃষকদের সংগঠিত করার কার্যক্রম শুরু করেন।

গ্রন্থাগারিক হিসেবে প্রচুর পড়ার অভ্যাস মাও সে তুংকে প্রথমে ইউরোপীয় সমাজতন্ত্র এবং পরবর্তীতে সহিংস বিপ্লবের দিকে ধাবিত করে।

মাও এমন এক সময়ে চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন, যখন চীনে এই দলের গুরুত্ব তেমন একটা ছিল না।

হুনানে এই দলটির শাখার গেরিলা নেতা হিসেবে সেখানে একটি ব্যর্থ কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানে নেতৃত্বও দেন তিনি।

পরবর্তীতে নিজ দেশের দুর্গম গ্রামে স্বাধীন কমিউনিস্ট ছিটমহল গড়ে তোলেন।

১৯২৩ সালে কুওমিনতাং (কেএমটি) জাতীয়তাবাদী দল উত্তর চীনের বেশিরভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারীদের পরাজিত করার জন্য মাও সে তুংয়ের দল সিসিপির সঙ্গে জোট বাঁধে।

কিন্তু রুশ বিপ্লবের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় ১৯২৭ সালে কেএমটি নেতা ও প্রধানমন্ত্রী চিয়াং কাই-শেকের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সরকার কমিউনিস্টদের চিরতরে নির্মূল করতে একটি শুদ্ধি অভিযান চালায়।

এই অভিযানে মাও সে তুংয়ের স্ত্রী ও বোনসহ হাজার হাজার মানুষ নিহত হন।

মাও এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীরা এই দমন-পীড়নের সময় দক্ষিণ-পূর্ব চীনের দিকে পিছু হটেন।

কেএমটির সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মাও সে তুং এবং আরেক শীর্ষস্থানীয় কমিউনিস্ট নেতা বিদ্রোহের ডাক দেন। যেটি নানচাং বিদ্রোহ নামে পরিচিত। তাদের নেতৃত্বে ১৯২৭ সালের আগস্টে গড়ে ওঠে রেড আর্মি।

পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালে তৎকালীন সরকার বা কুওমিনতাং (কেএমটি) জাতীয়তাবাদী দল তাদের ওপর আবার দমন-পীড়ন শুরু করলে মাও সে তুং ‘লংমার্চ’ শুরু করেন। এতে রেড আর্মির সদস্যরা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিল।

আগের অভিযানের পরে যেসব কমিউনিস্ট সদস্য জীবিত ছিলেন, তাদের নিয়ে নিজেদের নতুন আস্তানা বা ঘাঁটি তৈরির উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ছয় হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে মাও সে তুং উত্তর-পশ্চিম চীনের উদ্দেশ্যে এই ‘লংমার্চ’ পরিচালনা করেন।

তুষারঢাকা বিশাল পর্বতমালা, বিস্তৃত জলাভূমি ও ধু-ধু মরুভূমির প্রান্তরের বিপদসংকুল যাত্রাপথে লংমার্চ শেষে উত্তর-পশ্চিম চীনের এক নির্জন এলাকা ইয়ানআনে পৌঁছে কমিউনিস্টদের মাত্র ১০ শতাংশ বা আট হাজার জন জীবিত থাকেন।

পরবর্তীতে এই এলাকাতেই মাও সে তুং কমিউনিস্টদের নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলেন। সে সময় এমন পরিস্থিতিতে মনে হয়েছিল, চীনের কমিউনিস্ট আন্দোলন বুঝি শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে।

কিন্তু ঠিক সে সময়ই ১৯৩৭ সালে জাপান চীনে পূর্ণাঙ্গভাবে আগ্রাসন চালায়। শুধু একটি এলাকা নয়, বরং পুরো চীন দখল করতে চেয়েছিল জাপান।

১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে জাপানি আগ্রাসনের সময় নানজিংয়ে তিন লাখ মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। তার কিছুদিন পরেই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

এ সময় জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) এবং কুওমিনতাং (কেএমটি) সাময়িকভাবে আবারও জোটবদ্ধ হয়েছিল।

সেই সময় মাও সে তুং তাদের নতুন ঘাঁটি ইয়ানআনের বাইরের গুহাগুলোতে বসবাস করতেন এবং পশ্চিমা সাংবাদিকরা সেখানেই তার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।

যারা তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তাদের মধ্যে দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক লিয়াং শুমিন ছিলেন।

শুমিন মাও সে তুংকে বেশ আকর্ষণীয় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, মাও ছিলেন স্বচ্ছন্দ, উষ্ণ হৃদয়ের এবং স্বাভাবিক।

‘অত্যন্ত অভদ্র তবে সম্পূর্ণ কৃত্রিমতাহীন’, একইসঙ্গে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।

দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক শুমিনের নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তারা চীনের তখনকার দুটি মূল সমস্যার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন।

প্রথমত, গ্রামীণ সমস্যা—দেশের অধিকাংশ মানুষের চরম দারিদ্র্য। দ্বিতীয়ত, জাপানি আগ্রাসন থেকে জাতীয় মুক্তি।

শুমিনকে মাও সে তুং বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ সবকিছু বদলে দিয়েছে।’

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রানা মিত্তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এটি এমন একটি সংঘাত, যার কারণে যুদ্ধের সময়েই চীনে ১৪ মিলিয়ন বা তারও বেশি বেসামরিক ও সামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল।’

‘আট থেকে ১০ কোটি চীনা মানুষ নিজ দেশেই শরণার্থী হয়ে পড়েছিল। তাই চীনের রাজনীতি ও সমাজের দিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,’ বলেন অধ্যাপক মিত্তার।

কিন্তু ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আবার সিসিপি ও কেএমটির মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে যায় এবং গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে আমেরিকার সমর্থনে জাতীয়তাবাদীদের জনবল ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল। অন্যদিকে কমিউনিস্টরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছিল।

তবে কমিউনিস্টরা অস্ত্রের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও ইয়ানআনে ১২ বছর থাকার পর তাদের ভূমি সংস্কার কার্যক্রম গ্রামের সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেছিল। যা সামাজিক ন্যায়বিচারের সোনালি যুগের প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন প্রচারণার মাধ্যমে আরও জোরালো হয়েছিল।

এই গৃহযুদ্ধে মাও সে তুংসহ কমিউনিস্টরা জয়ী হন এবং ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর মাও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। যেখানে মাও সে তুং সেই বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই তিয়ানআনমেন গেটটি এখনো রয়েছে।

অন্যদিকে কেএমটির নেতা চিয়াং কাই-শেক তাইওয়ানে পালিয়ে যান।

চীনা সাম্রাজ্যের পতনের মাত্র ৩৮ বছর পর এবং জাপানি যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধে চীনা জনগণের সমস্ত দুর্ভোগের পর ওই সময় একটি সম্পূর্ণ নতুন সূচনার সম্ভাবনায় ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।

সাম্যবাদের প্রবর্তন, দুর্ভিক্ষ ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব

তবে কমিউনিস্টরা শেষ পর্যন্ত যত দ্রুত ক্ষমতা দখল করেছিল, তা তাদের কাঁধে অর্পিত বিশাল দায়িত্বকে কেবল আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

মাও সে তুংয়ের রাজনৈতিক দর্শন ‘মাওবাদ’ নামে পরিচিত। মূলত এটি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদেরই এক নতুন রূপ, যা তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও কৃষিভিত্তিক চীনা সমাজের বাস্তবতার ভিত্তি গড়ে তোলে।

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিশেষজ্ঞ আরনি রেয়া মনে করেন, এ কারণেই মাও এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতা চীনা সমাজ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।

এর অংশ হিসেবে শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং কৃষকদের সমবায়ভিত্তিক কৃষিকাজে যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি সব ধরনের বিরোধিতাকে কঠোর হাতে দমন করা হয়।

একপর্যায়ে সাম্যবাদের প্রবর্তন বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।

শুরুতে চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে বড় ধরনের সহায়তা পেলেও পরবর্তীতে দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে।

১৯৫৮ সালে সমাজতন্ত্রের আরও নিজস্ব বা ‘চীনা’ রূপ চালুর উদ্দেশ্যে মাও ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নীতি গ্রহণ করেন।

এর লক্ষ্য ছিল কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়াতে ব্যাপক মানুষকে শ্রমে নিয়োজিত করা। কিন্তু এর উল্টো ফল হিসেবে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং এর সঙ্গে খারাপ ফলন যুক্ত হয়ে তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে তিন কোটিরও বেশি মানুষ মারা যায়।

পরবর্তীতে এই নীতি বাতিল করা হলে মাওয়ের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় ১৯৬৬ সালের ১৬ মে মাও ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ শুরুর আদেশ জারি করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল দেশকে ‘অশুদ্ধ’ উপাদানমুক্ত করা এবং বিপ্লবী চেতনা ফিরিয়ে আনা।

মাও সে তুং মনে করেন, ‘এটা হবে এক নতুন বিপ্লব—এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। যে বিপ্লব ঘটবে মানুষের চিন্তায়। এর লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মনে যে সব পুরোনো ধ্যানধারণা আর অভ্যাস ছিল—সেগুলো সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা। মাও বিশ্বাস করতেন, এগুলো কমিউনিজমের পথে অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।’

এতে তার সহযোগী ছিলেন লক্ষ লক্ষ তরুণ—যাদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল রেড গার্ড নামের একটি বাহিনী। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাও সে তুংয়ের রেড গার্ডরা চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

সেসময় সাংস্কৃতিক বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন রেড গার্ডের সদস্য সো ইয়ং। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এই বিপ্লবের স্মৃতি বলেছিলেন তিনি।

পুরোনো যেকোনো কিছুই তাদের দ্বারা আক্রান্ত হলো। এর ফলে চীনের সামাজিক কাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু ছিলেন ভূস্বামীরা। এরা ছিলেন একসময়ের ধনী এলিট, যারা তাদের কথা শুনছিলেন না। তাদের প্রকাশ্যে অপমান করা হতে লাগল।

পুরো চীনজুড়ে রেড গার্ডরা এই কর্মসূচি চালু করল। এর শিকার হলেন স্থানীয় কর্মকর্তারা, এমনকি ছাত্ররাও। তাদের প্রকাশ্যে তিরস্কার করা হতো, কখনো কখনো শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হতো।

এই রকম গণ-অপমান কর্মসূচির একটি বড় লক্ষ্য ছিলেন শিক্ষকরা।

সারা চীনজুড়ে ক্লাসরুম ও লেকচার হলে শিক্ষকদের গালাগালি ও অপমান করত ছাত্ররা। তাদের পরিয়ে দেওয়া হতো গাধার টুপি, যা ছিল তাদের ভুল স্বীকারের চিহ্ন।

কাউকে কাউকে কলমের কালি খাইয়ে দেওয়া হতো, কারও মাথার চুল কামিয়ে দেওয়া হতো। কারও গায়ে থুথু ছিটানো হতো। অনেককে আবার মারধরও করা হতো। কিছু ক্ষেত্রে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।

তাদের ভাষায়, শিক্ষকরা ছিলেন বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, তাই তাদের বিশ্বাস করা যাবে না।

রেড গার্ডের সদস্য সো বলছিলেন, তার একজন শিক্ষককে যেভাবে অপমান করা হয়েছিল, সেখানে তিনি কিছুই করতে পারেননি।

‘১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আমি ভাবতে শুরু করলাম, এটা আমরা কী করছি। আমি উপলব্ধি করলাম যে পরিস্থিতি মাওয়ের নিয়ন্ত্রণে নেই। সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায়ও তার হাতে নেই,’ বলেন তিনি।

১৯৬৪ সালে প্রকাশিত মাও সে তুংয়ের বিখ্যাত উদ্ধৃতি সংকলন ‘লিটল রেড বুক’ বইটি চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় একধরনের ‘অবশ্যপাঠ্য’ হয়ে ওঠে।

মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেছিলেন পার্টির শোধনের জন্য। কিন্তু একটা সময় রেড গার্ডকে নিয়ন্ত্রণ করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। যে কেউ তাদের শিকার হতে পারত।

ওই সময় চীনে ১৫ লাখ মানুষ মারা যায় এবং দেশের বড় অংশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যায়।

এই বিপ্লবের সময় দলটির প্রেসিডেন্ট শিয়াও বহিষ্কৃত হন এবং অনেকটা একাকী অবস্থায় মারা যান। মাও সে তুংয়ের উত্তরাধিকারী মার্শাল লিন বিয়াও দেশ থেকে পালিয়ে যান। পরে মঙ্গোলিয়ায় বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন।

মাও সে তুংয়ের স্ত্রী জিয়াং কিং এবং তার সহযোগীরা মিলে গড়ে তোলেন ‘গ্যাং অব ফোর’। যারা সে সময় খানিকটা এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিজয় উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে দলের ভেতরে বামপন্থী এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেন।

অবশেষে ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে বহু শহর প্রায় নৈরাজ্যের মুখে পড়লে মাও সে তুং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী নামান।

আপাতত এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিজয় হয়েছে মনে হলেও মাও সে তুংয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।

তবে জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালান। ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফর করে মাওয়ের সঙ্গে দেখা করেন।

১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাও সে তুং মারা যান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন