পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ২৭ সেপ্টেম্বরের ইসলামাবাদমুখী মার্চকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো তীব্র হয়েছে। সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও বিপুলসংখ্যক আহতের আশঙ্কায় ইসলামাবাদের হাসপাতালগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত বেড প্রস্তুত, রক্তের মজুত নিশ্চিত, অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি চিকিৎসা বিভাগকে পূর্ণ সক্ষমতায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা। ডনের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ইসলামাবাদের হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পুরুষদের জন্য ১০টি এবং নারীদের জন্য ১০টি বেড সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। রক্ত ব্যাংককে অন্তত ১০০ ব্যাগ রক্তের মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স ও চালকদের প্রস্তুত রাখতে এবং অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এই উচ্চ সতর্কতা ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস)-কেও ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ট্রমা সার্ভিস, নার্সিং ও ডায়াগনস্টিক বিভাগকে পূর্ণ প্রস্তুতিতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে বাড়তি বেড, স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার প্রস্তুত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
আরও একটি প্রতিবেদনে, ড্রপ সাইট নিউজ-এর উদ্ধৃতি দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, কিছু হাসপাতালে নির্ধারিত ‘ইলেকটিভ’ বা জরুরি নয় এমন অস্ত্রোপচার স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, প্রশাসনিক ও সহায়ক কর্মীদের ছুটি স্থগিত রাখার পাশাপাশি ইতোমধ্যে ছুটিতে থাকা কিছু কর্মীকে কাজে ফিরতে বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থিতিশীল কিছু রোগীকে ছাড়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত বেড তৈরির করা হচ্ছে।
হাসপাতালের এমন প্রস্তুতি অবশ্যই সম্ভাব্য বড় ধরনের সহিংসতা ঘটবেই—এমন প্রমাণ নয়। গণসমাবেশ, রাজনৈতিক সংঘাত বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতির আগে হাসপাতালগুলোতে ‘মাস ক্যাজুয়ালটি’ প্রস্তুতি নেওয়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশও হতে পারে। তবে বেড সংরক্ষণ, রক্ত ও অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা, অস্ত্রোপচার স্থগিত এবং কর্মীদের ছুটি সীমিত করার মতো একাধিক পদক্ষেপ একই সময়ে নেওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের মাত্রা স্পষ্ট করে।
রাজধানী ঘিরে নিরাপত্তার বলয়
শুধু হাসপাতাল নয়, ইসলামাবাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ডন জানিয়েছে, পিটিআইয়ের মার্চ ছাড়াও আরও দুটি মার্চ রাজধানীমুখী হওয়ায় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেছে। শহরের প্রবেশপথ ও বিভিন্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক কনটেইনার রাখা হচ্ছে।
সরকারি পর্যায় থেকেও পিটিআইকে কর্মসূচি থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি বলেছেন, কর্মসূচি এগিয়ে গেলে সরকার পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি পিটিআইকে ‘ডেড-এন্ড’ পরিস্থিতিতে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইসলামাবাদ হাইকোর্টের ১৪ সেপ্টেম্বরের আদেশের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতৃত্বের জন্য ইসলামাবাদের সড়ক, মহাসড়ক, ইন্টারচেঞ্জ, টোল প্লাজা ও সরকারি ভবন দখল করে রাখার আইনগত অধিকার নেই বলে আদালত উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে পিটিআই তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। দলটির ঘোষিত লক্ষ্য ইমরান খানের মুক্তি এবং তার রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে সমর্থন প্রদর্শন। ফলে সরকার কর্মসূচি ঠেকাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আর পিটিআই তা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে এগোচ্ছে—এই দুই অবস্থানের সংঘাতই ২৭ সেপ্টেম্বরকে ঘিরে উত্তেজনার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
ইমরানের পরিবারের সদস্যদের আটক
মার্চের আগে পিটিআই ও ইমরান খানের পরিবারের ওপরও প্রশাসনিক চাপ বাড়ানো হয়েছে। ইমরান খানের বোন আলিমা খানকে লাহোরের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের আদেশে তাকে ৩০ দিনের জন্য আটক করার কথা বলা হয় এবং তার প্রকাশ্য উপস্থিতি জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হতে পারে বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ইমরানের আরও দুই বোন—ডা. উজমা খান ও নরিন নিয়াজি—আটক হওয়ার কথা জানিয়েছে ডন। তাদের ৩০ দিনের জন্য আটক করার আদেশে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পিটিআই অবশ্য এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এদিকে পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর আলী খান দাবি করেছেন, মার্চের আগে প্রায় ১,৫০০ দলীয় কর্মী, পাঁচজন সংসদ সদস্য ও একজন মন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে।
কেন হাসপাতাল প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে সাধারণত পুলিশ, রেঞ্জার্স, ব্যারিকেড ও সড়ক নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। কিন্তু এবার হাসপাতালগুলোকেও একই সঙ্গে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ফলে ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি কেবল রাজনৈতিক সমাবেশের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; সম্ভাব্য আহতের চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতাও নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে হাসপাতালের প্রস্তুতিকে সম্ভাব্য প্রাণহানির নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা সমীচীন হবে না। বরং এটি কর্তৃপক্ষের ঝুঁকি-প্রস্তুতির একটি সূচক। প্রকৃতপক্ষে কতজন আহত বা নিহত হবেন, আদৌ বড় ধরনের সংঘর্ষ হবে কি না—তা কর্মসূচির সময়কার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
তবে অতীতের রাজনৈতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান গ্রেপ্তার অভিযান, রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার এবং হাসপাতালগুলোর বিশেষ প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বরকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংঘাত এড়ানোর প্রশ্ন
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার, জননিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য। সরকার যেখানে নিরাপত্তা ও আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের কথা বলছে, পিটিআই সেখানে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে। দুই পক্ষের অবস্থান যতটা কঠোর হবে, রাজপথে উত্তেজনার ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে—এটি পরিস্থিতিগত বিশ্লেষণ, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
হাসপাতালগুলোতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য এখানেই—কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই প্রস্তুতি কি শেষ পর্যন্ত কেবল সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই থাকবে, নাকি ২৭ সেপ্টেম্বরের রাজনৈতিক কর্মসূচি সত্যিই বড় ধরনের সংঘাতের দিকে গড়াবে।
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয়টি নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে রাজধানীর নিরাপত্তা প্রস্তুতি, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং হাসপাতালগুলোর ‘মাস ক্যাজুয়ালটি’ প্রস্তুতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র উত্তেজনার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে।
সূত্র: ডন, এনডিটিভি, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, রয়টার্স
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


