ইসলামি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং খামেনি হত্যার প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা করল ইরান

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ইসলামি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং খামেনি হত্যার প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা করল ইরান
ছবি : রয়টার্স

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্মরণে রাজধানী তেহরানে বড় আকারের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সি খামেনি নিহত হন। এর আগে তিনি প্রায় ৩৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা স্মরণস্থলসহ বিভিন্ন গণসমাবেশে লাল পতাকা দেখা গেছে। শিয়া ইসলামে লাল পতাকাকে শাহাদাতের প্রতীক ও প্রতিশোধের চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে’। লাল ও কালো পটভূমিতে খামেনির একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি দিয়ে এই স্লোগান প্রচার করা হচ্ছে।

শনিবার ভোররাত থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মোসাল্লা প্রাঙ্গণে জড়ো হন। খামেনির কফিনটি একটি লরিতে করে অনুষ্ঠানস্থলে আনা হয়। কফিনটি মঞ্চের মাঝখানে একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মে রাখা হয়েছে। এটি কাচ দিয়ে ঘেরা এবং

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যরা পাহারা দিচ্ছেন। ইসলামি রীতিনীতি বজায় রাখতে পুরুষ ও নারী দর্শনার্থীদের মধ্যে একটি বড় ব্যারিয়ার দেওয়া হয়েছে। লাউড স্পিকারে ধর্মীয় গান ও স্লোগান প্রচার করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, মেট্রো স্টেশনগুলোতে জনতা ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘ইসরাইল ধ্বংস হোক’ বলে স্লোগান দিচ্ছে।

সমাবেশে আসা ফাতিমা (৫৫) নামের এক নারী আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা সবাই আমাদের নেতার রক্তঋণ শোধ ও প্রতিশোধ নিতে এখানে এসেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সবাই তার ছেলের কথা শুনব। তিনিই বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’

গত মার্চ মাসে খামেনি হত্যাকাণ্ডের পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেয় একটি ধর্মীয় কাউন্সিল।

কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা

রাজধানীজুড়ে সাঁজোয়া যান, ভারী মেশিনগান ও স্নাইপারসহ কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখা গেছে। মোসাল্লায় প্রবেশের সময় পুরুষদের দেহ তল্লাশি করা হচ্ছে। পাওয়ার ব্যাংক, ইয়ারফোন ও লাইটারের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করছে নিরাপত্তা কর্মীরা। তবে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না।

কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, ১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি জানাজার মতো এবারও বিশাল জনসমাগম হবে। খোমেনি জানাজায় ভিড়ের চাপে অন্তত আটজন মারা গিয়েছিলেন এবং সামরিক বাহিনী হেলিকপ্টারে করে তার লাশ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল।

তেহরানজুড়ে হাজার হাজার ‘মোকেব’ (সাময়িক ধর্মীয় সেবা কেন্দ্র) স্থাপন করা হয়েছে। তীব্র গরম ও ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকায় কিছু মোকেবে বিশাল কুলিং ফ্যান এবং বিনামূল্যে পানীয় বিতরণ করা হচ্ছে। জরুরি চিকিৎসা দল সেখানে উপস্থিত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।

তেহরানের বড় অংশ ব্যারিয়ার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে এবং বেসরকারি যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জনসমাগম বাড়াতে সোমবার পর্যন্ত পুরো ইরান কার্যত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশজুড়ে প্রায় ১ কোটি মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানাজার মিছিল

আগামী সোমবার তেহরানের মধ্য দিয়ে খামেনির লাশ নিয়ে জানাজার মিছিল হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর লাশটি শিয়াদের পবিত্র স্থান কোম, নাজাফ ও কারবালা হয়ে আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে দাফন করা হবে।

এদিকে, অনেক ইরানি এই সরকারি ছুটিকে কাজে লাগিয়ে তেহরানের ভিড় ও গরম থেকে বাঁচতে কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরের শীতল প্রদেশগুলোতে যাচ্ছেন। যার ফলে তেহরান-শুমাল এক্সপ্রেসওয়েতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এসে আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি রাষ্ট্রীয় টিভিকে বলেন, খামেনির জন্য এমনভাবে শোক প্রকাশ করতে হবে যেন শত্রুরা আমাদের আত্মসমর্পণের আশা নিয়ে কবরে চলে যায়। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস প্রধান মজিদ মুসাভিও জনসমক্ষে এসেছেন।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছিলেন, মোজতবা খামেনি ‘মৃত্যুর তালিকায়’ রয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দফতর অনুষ্ঠান চলাকালীন যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বিবৃতি দিয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গতকাল তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ গতকাল ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

তেহরানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভারতের বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি প্রমুখ।

আরো ছিলেন ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরা।

সূত্র: আলজাজিরা. এফপি

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন