রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় হঠাৎ অবতরণ করল মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি বোয়িং সি-১৭ গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান। বিমানটির আগমন নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য ছিল না ক্রেমলিনের কাছেও। এর কয়েক ঘণ্টা পর জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র্যাটক্লিফ গোপন বৈঠকে অংশ নিতে মস্কো সফর করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের বরাত দিয়ে বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
র্যাটক্লিফের সফরের উদ্দেশ্য কী, তিনি মস্কোয় কার সঙ্গে বৈঠক করবেন কিংবা কী নিয়ে আলোচনা হবে—এসব বিষয়ে ওয়াশিংটন ও মস্কো কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্ক যখন তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ, তখন সিআইএ প্রধানের এমন আকস্মিক ও অঘোষিত সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
উচ্চপর্যায়ের মার্কিন ও রুশ কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক এমনিতেই বিরল। তার ওপর সফরটি সম্পর্কে আগে থেকে কোনো ঘোষণা না থাকায় এর উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সামরিক বিমানে মস্কো, কূটনৈতিক বহরের ভিডিও
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্যেও র্যাটক্লিফের সফরের বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে লাটভিয়া হয়ে একটি বড় মার্কিন সামরিক বিমান রাশিয়ায় যায়। পরে সেটি মস্কো ছেড়ে লাটভিয়ার রাজধানী রিগায় ফিরে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে মস্কোর ভনুকোভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে সি-১৭ পরিবহন বিমানটিকে যেতে দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে মস্কোর রাস্তায় একটি কূটনৈতিক গাড়িবহর চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে ওই বহরে র্যাটক্লিফ ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ইউক্রেনকে হামলা বন্ধের অনুরোধ
র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে বিষয়টি জানিয়েছিল বলে দাবি করেছেন এক জ্যেষ্ঠ ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা। সিবিএসকে তিনি বলেন, একটি উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল মস্কো সফর করবে বলে কিয়েভকে জানানো হয়েছিল।
প্রতিনিধিদলটি রাশিয়া থেকে চলে না যাওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনকে হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধও করা হয়েছিল বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সিআইএ পরিচালক হিসেবে র্যাটক্লিফের এটি রাশিয়ায় প্রথম সফর বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মস্কোয় থাকা রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে।
‘কিছু একটা ঘটছে’
র্যাটক্লিফের আকস্মিক সফরের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নিয়ে মন্তব্য করেছেন ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মস্কোয় ব্রিটিশ সামরিক অ্যাটাশে হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জন ফোরম্যান।
রেডিও ফোরের ‘পিএম’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সফরটির অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে ‘উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ’। জার্মানিতে সাম্প্রতিক ড্রোন তৎপরতার সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যে জল্পনা চলছে, তার সঙ্গেও সফরটির যোগ থাকতে পারে।
ফোরম্যান বলেন, কোনো বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি না হলে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত এত অল্প সময়ের নোটিশে এবং গোপনে এত উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাকে মস্কোয় পাঠায় না।
তার ভাষায়, ‘কিছু একটা ঘটছে’ বলেই এমন সফর হতে পারে।
রাশিয়ায় আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বন্দিবিনিময়ে র্যাটক্লিফের ভূমিকা
রুশ-মার্কিন নাগরিক ক্সেনিয়া কারেলিনার মুক্তির আলোচনায় র্যাটক্লিফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে রাশিয়ায় এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দী ছিলেন কারেলিনা।
এর আগে ২০২৪ সালে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তিতেও সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওই চুক্তির মাধ্যমে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক ইভান গেরশকোভিচ, সাবেক মার্কিন মেরিন পল হুইলান এবং রুশ-মার্কিন সাংবাদিক আলসু কুরমাশেভাসহ বেশ কয়েকজন মুক্তি পান।
ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের পরও অচলাবস্থা
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই ওয়াশিংটন ও মস্কোর সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ। এরপর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পশ্চিমা দেশগুলো দেশটির ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর র্যাটক্লিফই রাশিয়া সফর করা সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে গত বছর আলাস্কায় এক শীর্ষ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প। তবে ওই বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতি আসেনি।
পরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আলোচনা শুরু হলেও তা এখন অনেকটাই স্থবির। এমন পরিস্থিতিতে সিআইএ প্রধানের গোপন মস্কো সফর নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

