হাইতি ও সিরিয়ার লাখো অভিবাসীর মানবিক সুরক্ষা কবচ বা সাময়িক সুরক্ষা মর্যাদা (টিপিএস) বাতিলের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পথ পরিষ্কার করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট।
গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতের ৬-৩ বিচারকের এক রায়ে রক্ষণশীল বিচারকেরা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানকে সমর্থন জানান। এই রায়ের ফলে দেশ দুটি থেকে আসা অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার আইনি অধিকার বাতিল হবে এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত বা ডিপোর্ট করার পথ উন্মুক্ত হবে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটন ডিসির ফেডারেল আদালতের আগের সিদ্ধান্তগুলো বাতিল হয়ে গেল। এর আগে নিম্ন আদালতের বিচারকেরা ট্রাম্প প্রশাসনের টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছিলেন। নতুন এই রায়ের ফলে হাইতির ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি এবং সিরিয়ার ৬ হাজার ১০০ অভিবাসী সরাসরি প্রভাবিত হবেন। একই দিনে সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্ত নীতিকে সমর্থন করে আরেকটি রায় দিয়েছেন।
কোনো দেশে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো বড় বিপর্যয় দেখা দিলে সেখান থেকে আসা নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িকভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এটিই টিপিএস বা টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস নামে পরিচিত।
২০১০ সালে হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এবং ২০১২ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এই দুই দেশের নাগরিকদের টিপিএস সুবিধা দিয়েছিল। অথচ বর্তমানে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে ব্যাপক সহিংসতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও অপহরণের আশঙ্কায় হাইতি বা সিরিয়া ভ্রমণে সতর্কতা জারি রয়েছে।
আদালতের যুক্তি ও বর্ণবাদের বিতর্ক
আদালতের এই সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের লেখক রক্ষণশীল বিচারক স্যামুয়েল আলিটো রায়ে উল্লেখ করেছেন, টিপিএস বাতিলের বিষয়ে প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর আদালতের কোনো পর্যালোচনা করার আইনি অধিকার নেই। টিপিএস সংক্রান্ত আইনটি আদালতের এই ধরণের হস্তক্ষেপকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করে।
তিনি বলেন, হাইতি থেকে আসা অভিবাসীরা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে বর্ণবাদী বা বৈষম্যমূলক বলে যে দাবি করেছেন, আইনিভাবে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তবে উদারপন্থি তিন বিচারক সোনিয়া সোতোমেয়র, কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন এবং এলিনা কাগান এই রায়ের বিরোধিতা করেছেন। বিচারক এলিনা কাগান তার ভিন্নমতের নোটে লিখেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান টিপিএস আইনের সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন কি-না, তা পর্যালোচনার সুযোগ আদালতের রয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে যে বর্ণবাদের ভূমিকা ছিল, তার প্রমাণ স্পষ্ট। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্যের উদাহরণ দেন। ওই সময় ট্রাম্প ওহাইওতে হাইতির অভিবাসীদের নিয়ে কুকুর-বিড়াল খাওয়ার মিথ্যা দাবি করেছিলেন এবং হাইতিয়ান অভিবাসনকে দেশের জন্য আত্মঘাতী বলে অভিহিত করেছিলেন।
তবে বিচারক আলিটো বলেন, ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের কোনোটিই সরাসরি বর্ণবাদী ছিল না।
প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি দেশের প্রায় ১৩ লাখ অভিবাসী টিপিএস সুবিধার আওতায় আছেন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের প্রভাব তাদের সবার ওপর পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, টিপিএস সব সময়ই একটি সাময়িক ব্যবস্থা ছিল এবং এটিকে অবৈধ অভিবাসীদের স্থায়ীভাবে থাকার ফাঁকফোকর হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে ওহাইওর 'হাইতিয়ান সাপোর্ট সেন্টার'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ভাইলস ডরসেইনভিল বলেন, এই রায়ের ফলে হাজার হাজার পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে। হাইতি যে বর্তমানে নিরাপদ নয়, তা সবাই জানে।
সিরীয় বাদীদের আইনজীবী আহিলান আরুলানানথাম বলেন, আদালত প্রশাসনকে একটি মৌলিক মানবিক সুরক্ষা নীতি উপেক্ষা করার অনুমতি দিলেন।
হাইতিয়ান অভিবাসীদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এখন এই মানুষদের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব মার্কিন কংগ্রেসের ওপর নির্ভর করছে।
গত বছরের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বৈধ ও অবৈধ অভিবাসন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট ভেনেজুয়েলার লাখো মানুষের টিপিএস সুবিধাও বাতিল করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তা ছাড়া বর্ণ বা ভাষার ওপর ভিত্তি করে অভিবাসীদের ডিপোর্ট করার নীতিও এর আগে আদালত বহাল রেখেছেন।
গত বছর ট্রাম্পের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি উল্লেখ করে সিরিয়া ও হাইতির টিপিএস সুবিধা বাতিল করেছিলেন। পরে মার্চ মাসে ট্রাম্প তাকে বরখাস্ত করলেও তার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বহাল থাকে, যা এখন সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করলেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্রুকলিনের লিটল হাইতি এলাকার প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সংকট তৈরি হয়েছে। বহু পরিবার তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন গভীর চিন্তায় পড়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


