ভারতে মোদিবিরোধী দলগুলো এক ছাতার নিচে, নতুন রাজনৈতিক চাপে সরকার

ভারতে মোদিবিরোধী দলগুলো এক ছাতার নিচে, নতুন রাজনৈতিক চাপে সরকার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন আন্দোলনকে এক জায়গায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিরোধীদের প্রতিবাদ এবার বড় সমাবেশে রূপ নিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা মোদি সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

রোববার নয়াদিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে এই সমাবেশের আয়োজন করেছে বিরোধী জোট। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিশাল এই মাঠ ভারতের বড় বড় রাজনৈতিক সমাবেশের ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। সমাবেশে শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, নারী ও তরুণদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কংগ্রেসের লক্ষ্য, সমাবেশে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

সমাবেশের আগে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারাচ্ছেন। তাদের ভোট কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও গভীর মানসিক যন্ত্রণা তৈরি হয়েছে। আমরা ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই করছি। ভোটই সব ভারতীয়র মতপ্রকাশের মাধ্যম।’

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক

পুরো আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) নামে এই কার্যক্রমের আওতায় দেশজুড়ে ভোটার তালিকা যাচাই ও হালনাগাদ করা হচ্ছে।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার নিবন্ধিত এবং ভোটার হওয়ার অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়াই এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।

গত বছর শুরু হওয়া এই সংশোধন কার্যক্রমে ১৩ কোটির বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ব্যক্তি মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত এবং ৩ কোটি মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তাদের দাবি, এসব সম্প্রদায়ের ভোটারদের বাদ পড়ার ফলে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি নির্বাচনী সুবিধা পেতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি উভয়েই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেও মতবিরোধের খবর প্রকাশিত হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তাঁরা কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফরম পরিবর্তন এবং নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা ইসিআইনেটের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও ছিল।

বিতর্কের মুখে গত ২৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন সংশোধন কার্যক্রম শেষ হওয়া ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বাদ পড়া ভোটার এবং নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এ ক্ষেত্রে নতুন করে ফরম-৬ ব্যবহারের কথা বলা হয়।

আন্দোলনে যুক্ত হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

এবারের আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আগে আলাদাভাবে চলা দুটি প্রতিবাদী ধারার একসঙ্গে যুক্ত হওয়া। বিরোধী জোটের সঙ্গে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে সংহতি জানিয়েছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

গত মাসে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বড় কয়েকটি বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল এই সংগঠন। তাদের বক্তব্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রধান হিসেবে জ্ঞানেশ কুমারের প্রয়োজনীয় আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা আর নেই। তাই তাকে পদত্যাগ করতে হবে।

এর আগে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে ককরোচ জনতা পার্টির একটি আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছিলেন কয়েক হাজার তরুণ। ওই আন্দোলনের চাপে একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, যা দেশটির রাজনীতিতে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। এর মধ্য দিয়ে জনমতের চাপ সরকারের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।

নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত মাস থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছেন বিভিন্ন বিরোধী দল, শিক্ষার্থী সংগঠন ও তরুণ আন্দোলনকারীরা।

নির্বাচন কমিশন প্রধানের প্রতীকী অভিশংসন

সমাবেশের আগের দিন শনিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী গণ-অভিশংসন কর্মসূচি পালন করেন বিরোধী জোটের নেতারা। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে তাঁর অপসারণের দাবি আরও জোরালো করা হয়।

সাবেক লোকসভা স্পিকার মীরা কুমার সেখানে বলেন, ‘পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভোটার। একজন ভোটারকেও যদি ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তা আমাদের গণতন্ত্রের মূল চেতনার ওপর আঘাত।’

অন্যদিকে, বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে বিজেপি ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির দাবি, রাহুল গান্ধী ও তার সহযোগীরা নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযথা প্রশ্নবিদ্ধ করে গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।

বিজেপি আরো সমালোচনা করেছে, ১৯৮৪ সালের ভয়াবহ শিখবিরোধী দাঙ্গার ৪২তম বার্ষিকীর দিনে বিরোধীরা সমাবেশের আয়োজন করেছে।

দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা, শর্তসাপেক্ষে সমাবেশের অনুমতি

রোববারের সমাবেশ ঘিরে দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রামলীলা ময়দানের আশপাশে লাঠি ও ঢাল হাতে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি রাখা হয়েছে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানবাহন।

সমাবেশে বিপুল মানুষের উপস্থিতির আশঙ্কায় দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প পথ নির্ধারণের প্রস্তুতি নিয়েছে। পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোহিত রাজবীর জানিয়েছেন, সমাবেশস্থল ও মিছিলের পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে দিল্লি পুলিশ সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে কিছু শর্তে। রামলীলা ময়দানের বাইরে অন্য কোথাও মিছিল করা যাবে না এবং বিকেল ৫টার মধ্যে কর্মসূচি শেষ করতে হবে। সমাবেশস্থলে নজরদারির জন্য ক্যামেরা ও নিরাপত্তাকর্মীর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এর আগে গত ১০ অক্টোবর সংসদ ভবনের কাছের জন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচি ঠেকাতে ব্যাপকসংখ্যক আন্দোলনকারীকে আটক করেছিল প্রশাসন। এতে দেশটিতে প্রতিবাদ ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ কতটা রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।

মোদির বিরুদ্ধে আগেও বড় আন্দোলন

ভারতের রাজনীতিতে রামলীলা ময়দান দীর্ঘদিন ধরে বড় আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ২০১১ সালে দুর্নীতিবিরোধী এক আন্দোলনে সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। ওই আন্দোলন দেশজুড়ে তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সরকারের পরাজয় ঘটে।

এরও আগে ১৯৭৫ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে রামলীলা ময়দানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশ ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল।

মোদি ক্ষমতায় আসার পরও তার সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক বড় গণআন্দোলন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এবং প্রায় এক বছর ধরে চলা কৃষক আন্দোলন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনটি অমুসলিম অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে। এসব আন্দোলনের কোনো কোনোটি প্রাণঘাতী সংঘর্ষেও রূপ নেয়।

তবে দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন মোদি। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের বিক্ষোভের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান সমর্থন যুক্ত হওয়ায় ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটি তৈরি হয়েছে। যদিও আপাতত সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালের আগে হওয়ার কথা নয়।

সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন এখন শুধু নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণদের ক্ষোভ, পরীক্ষায় অনিয়ম নিয়ে অসন্তোষ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। এসব আন্দোলনকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে মোদি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে বিরোধী জোট।

সূত্র: ব্লুমবার্গ, দ্য জাপান টাইমস, রয়টার্স, দ্য স্টার, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আলজাজিরা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...