ক্যানসারের যেসব লক্ষণ উপেক্ষা করলে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ক্যানসারের যেসব লক্ষণ উপেক্ষা করলে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি

শিশুদের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি, শারীরিক দুর্বলতা কিংবা অ্যালার্জি ভেবে উপেক্ষা করেন অভিভাবকেরা। অথচ এসব লক্ষণের কিছু দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ক্রমে বাড়তে থাকলে তা গুরুতর অসুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই শিশুদের শারীরিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাজ্যে ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের রোগজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ক্যানসার। তবে রোগটি তুলনামূলক বিরল হলেও দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণ শনাক্ত করার বিষয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী নন।

বিজ্ঞাপন

ক্যানসার রিসার্চ ইউকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রতিব ছর শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রায় ১ হাজার ৯০০ শিশুর ক্যানসার শনাক্ত হয়। এ ছাড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি আরও প্রায় ২ হাজার ৩০০ কিশোর-কিশোরী ও তরুণের প্রতি বছর ক্যানসার ধরা পড়ে।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন

শিশুদের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বব ফিলিপসের মতে, কোনো একটি লক্ষণের পরিবর্তে একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। বিশেষ করে লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, ক্রমে বাড়তে থাকলে কিংবা আরও তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

যেসব লক্ষণ দেখা গেলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন—

অস্বাভাবিক ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকা বা স্বাভাবিক কাজকর্মে আগ্রহ ও সক্ষমতা কমে যাওয়া।

ত্বক অতিরিক্ত ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া: শিশুর স্বাভাবিক ত্বকের রঙের তুলনায় অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে দেখানো।

অকারণে কালশিটে দাগ: আঘাতের স্পষ্ট কারণ ছাড়াই শরীরে কালশিটে পড়া।

শরীরে পিণ্ড বা ফোলা: শরীরের কোথাও পিণ্ড দেখা দেওয়া, ফোলা তৈরি হওয়া কিংবা সময়ের সঙ্গে তা বড় হতে থাকা বা না কমা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের শরীরে ক্যানসার কখনো কখনো প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় দ্রুত বিকশিত হতে পারে। ফলে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর সেগুলোকে দীর্ঘ সময় সাধারণ সমস্যা ভেবে উপেক্ষা না করাই গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু ও তরুণদের ক্যানসারবিষয়ক সংগঠন সিসিএলজির বিশেষজ্ঞরা রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং দ্রুত রোগ শনাক্তের লক্ষ্যে পরিচালিত জাতীয় প্রচারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এ প্রচারণায় চিকিৎসকদের জন্য ‘তিনের নিয়ম’ অনুসরণের কথাও বলা হয়েছে। কোনো শিশুর তিনটি উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে, একই সমস্যায় তিনবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হলে অথবা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না—এমন উপসর্গ টানা তিন সপ্তাহ থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

১০ দিনের মধ্যে ধরা পড়ে অ্যামেলিয়ার ক্যানসার

যুক্তরাজ্যের ১৩ বছর বয়সি অ্যামেলিয়া ক্যারলের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ কীভাবে সহজেই উপেক্ষিত হতে পারে। গত বছর অ্যামেলিয়ার অ্যাকিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া (এএমএল) শনাক্ত হয়। বর্তমানে তিনি রোগমুক্তির পর্যায়ে রয়েছেন।

অ্যামেলিয়ার মা জেমা ক্যারল জানান, শুরুতে মেয়ের অতিরিক্ত ক্লান্তি ও সামান্য শারীরিক পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠার বিষয়টি তারা তেমন গুরুত্ব দেননি। মেয়ের শারীরিক সক্ষমতা কম কিংবা স্কুল থেকে ফেরার পর ক্লান্ত হয়ে পড়ছে—এমনটাই ভেবেছিলেন তাঁরা।

কিন্তু হঠাৎ শরীরে কালশিটে দাগ দেখা দেওয়ার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন জেমা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে কোনো কারণ ছাড়াই মেয়ের শরীরে একটি লালচে দাগ দেখা যায়। তিন দিন পর দুই পায়ের শিন বা সামনের নিচের অংশে একাধিক উঁচু ও ব্যথাযুক্ত কালশিটে দাগ দেখা দেয়।

নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে গিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রের কর্মীরাও অ্যামেলিয়ার চোখে কিছু রক্তনালি ফেটে যাওয়ার লক্ষণ দেখতে পান। তবে কেন এমন হয়েছে, তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। এরপর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে অ্যামেলিয়ার লিউকেমিয়া শনাক্ত করেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করা হয়।

জেমা জানান, মেয়ের ক্যানসার নিশ্চিত হওয়ার দিন তাকে বিষয়টি জানালে অ্যামেলিয়া জিজ্ঞাসা করেছিল, তার ক্যানসার হয়েছে কি না এবং সে মারা যাবে কি না। জেমা মেয়েকে আশ্বস্ত করে বলেন, চিকিৎসকেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তাদের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে অ্যামেলিয়া নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। প্রতি তিন মাস পরপর তার অস্থিমজ্জা ও রক্ত পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি সে আবার স্কুলেও ফিরেছে।

‘জেককে যেন মানুষ মনে রাখে’

শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর আরেকটি উদাহরণ জেক সুইনসকোর ঘটনা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিরল ধরনের নরম টিস্যুর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় সে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জেকের স্টেজ-থ্রি ফিউশন-পজিটিভ অ্যালভিওলার র‌্যাবডোমায়োসারকোমা শনাক্ত হয়। এটি নরম টিস্যুতে তৈরি হওয়া এক ধরনের ক্যানসার।

রোগ শনাক্তের আগে জেকের নাক বন্ধ থাকা ও চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গকে অ্যালার্জি বা হে ফিভার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। স্কুল থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ার বিষয়টিও পরীক্ষার মেয়াদ শেষের ক্লান্তি বলে মনে করা হয়।

জেকের মা লিনসি সুইনসকো জানান, ছেলের নাকের ওপরের অংশে ফোলা দেখা দেওয়ার পরই তাঁরা চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখনো ক্লান্তি, অ্যালার্জির মতো উপসর্গ এবং নাকের ফোলার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে বলে তারা ভাবেননি।

পরীক্ষায় জেকের নাক ও নাসাগহ্বরে একটি পিণ্ড পাওয়া যায়। পরে তার ক্যানসার শনাক্ত হয়। চিকিৎসার অংশ হিসেবে সে নয় দফা কেমোথেরাপি ও প্রোটন বিম রেডিয়েশন নেয়।

তবে কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় খিঁচুনি ও গুরুতর অসুস্থতার মুখে পড়ে জেক। এরপর সে আর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চায়নি। ২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল বাড়িতেই শান্তিতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করে সে। মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ পর তার ১৪তম জন্মদিন ছিল।

লিনসি বলেন, মৃত্যুকে নিয়ে জেক ভয় পেত না। মা-ছেলের মধ্যে এ বিষয়ে অনেক কথা হয়েছিল। তবে জেকের একটি উদ্বেগ ছিল—মৃত্যুর পর মানুষ তাকে মনে রাখবে কি না।

ছেলের স্মৃতি তুলে ধরে লিনসি বলেন, মানুষ যেন জেককে ভুলে না যায় এবং তার অসাধারণ জীবন সম্পর্কে জানতে পারে, সে জন্যই তিনি কাজ করছেন। তার কাছে ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রচেষ্টাই ছেলের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি উপায়।

দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার চাপ কমতে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্যানসার শনাক্তে দেরি হলে চিকিৎসা আরও জটিল ও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাজ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় অর্ধেকের রোগ দুই সপ্তাহের মধ্যে শনাক্ত হয়। তবে বাকিদের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে ১৬, ১৮, ২০ এমনকি ২৫ সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।

অধ্যাপক বব ফিলিপসের মতে, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম তীব্রতার চিকিৎসার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে আশার বিষয় হলো, গত শতকের সত্তরের দশকের তুলনায় শিশুদের ক্যানসারে বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশের বেশি রোগ শনাক্তের পর পাঁচ থেকে ১০ বছর বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকে।

ক্যানসার রিসার্চ ইউকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর চার লাখের বেশি মানুষের নতুন করে ক্যানসার শনাক্ত হয়। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, তাঁদের মধ্যে মাত্র ৫৪ শতাংশের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএসের নির্ধারিত ২৮ দিনের সময়সীমার মধ্যে রোগ শনাক্তের বিষয়টি জানানো হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুদের শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে লক্ষণগুলোর স্থায়িত্ব ও পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে, সেগুলো বাড়তে থাকলে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, দ্রুত রোগ শনাক্তের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করা এবং শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...