কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা শুরু হয়েছে মঙ্গলবার। কিন্তু বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন না থাকায় বইমেলা যেন গড়ের শূন্য মাঠ।মানুষের ভিড় নেই। বাংলাদেশের বই কেনার জন্য নেই কোনও লম্বা লাইনও। গত বছরই ঐতিহ্যবাহী রিকশাকে সামনে রেখে সেজে উঠেছিল বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন। হাজির হয়েছিল হরেক রকম বই।
বিদেশি অনুবাদ বইয়ের জন্য এখন বাংলাদেশই ভরসা। স্টলে ঘুরতে ঘুরতে এক প্রৌঢ় বইপ্রেমী জানালেন, সেই ১৯৯৬ সাল থেকে দেখছি কলকাতা বইমেলা আলো করে থাকে বাংলাদেশের স্টল। গিল্ড কত বড় জায়গা দিত প্যাভিলিয়নের জন্য। হুমায়ূন আহমেদ এসেছিলেন, সেবার কী লম্বা লাইন! সেসব স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করছে তার। কিন্তু এবার কাঁটাতারের বেড়ায় যেন আটকে গেছে বইও।
গত বছরের পাঁচ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের একশ্রেণির মিডিয়া ও রাজনৈতিক দল চরমভাবে বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছেন। এই আবহে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় একপ্রকার নিষিদ্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশ। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতাও এর একটি প্রধান কারণ। কিন্তু বইপিপাসুদের মন তো মানে না।
সুদূর মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা বইমেলায় এসেছেন রুবাই নিসা। ইতিহাসের আকর বই সংগ্রহ করেন তিনি। আর এর জন্য নির্ভরশীল ছিলেন বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নের উপর। এবার তিনি হতাশ হয়ে জানালেন, এক ঘণ্টাতেই বইমেলা ঘোরা শেষ। যেসব বই কিনব ভেবেছিলাম, সেসব একটাও পেলাম না।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ইসলামি বইয়ের চাহিদাও ব্যাপক। লেখা প্রকাশনী, মল্লিক ব্রাদার্স, বিশ্ববঙ্গীয়, ইসলামিক বুক সেন্টার, হরফের মতো স্টলগুলিতে মূলত বাংলাদেশি বইই বেশি বিক্রি হত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকাশক জানালেন, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড অলিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে, বইমেলায় বাংলাদেশি বই রাখা যাবে না। এতে আমাদের বিশাল ক্ষতি। ব্যবসা মার খাচ্ছে। ৬০ হাজার টাকা দিয়ে স্টল নিয়েছি। খরচের দামই উঠবে না। বাংলাদেশের ইসলামি বইই তো কিনতেন আমাদের জেলার পাঠকরা। তারা এসে হতাশ হচ্ছেন। বছরে এই একবারই বড় একটা ব্যবসা হয়। এবার সেটাও হল না!
পাঠক থেকে প্রকাশক, সবাই হতাশ এবারের বইমেলায়। সেন্ট্রাল পার্কের বইমেলা প্রাঙ্গণের বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের জায়গাটা খাঁ খাঁ লাগছে। সবাই সেটা অনুভব করছেন। বাঙালি হয়ে কেন এই বাধা! চেন্নাইতে একটি বইমেলা হচ্ছে, সেখানে তো বাংলাদেশি স্টল রয়েছে! বইমেলা মাঠে দাঁড়িয়ে অনিন্দিতা বসু নামের এক পাঠিকা জানালেন, বিদ্বেষ মানুষকে মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে দেয় না। সেটা কাঁটাতারের ওপারে হোক বা এপারে। কিছু মানুষ ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে বলে পাল্টা আমরাও বিদ্বেষ ছড়াবো, এটা কোনও ভাবনা হতে পারে না। সেটা যে কোনো দেশ বা ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যারাই কাজটি করছেন, তাদের বিচার বুদ্ধি সঠিক স্থানে ফিরে আসুক।
সাহিত্যিক ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অংশুমান কর জানান, কলকাতা বইমেলা আলো করে থাকত বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন। সেখান থেকে পছন্দের ও বেশ কিছু কাজের বই কিনতাম আমি। কলেজ স্ট্রিটে বাংলাদেশের বই সারা বছর পাওয়া গেলেও বইমেলায় এই প্যাভিলিয়নের একটা আলাদা মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব ছিল। অংশুমান কর গোটা বিষয়কে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন। একই মত কবিলেখক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাহিত্যিক অমর মিত্রের। তাদের মত, এটা একদম অসমীচীন কাজ হয়েছে! বাংলাদেশ না থাকার যন্ত্রণা সবাই বোধ করছেন।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড নামক অসরকারি সংস্থা। বাংলাদেশ না আসতে পারায় গিল্ড কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন ও দুঃখিত বলে জানাচ্ছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জটিলতার কারণেই বাংলাদেশ এবার অনুপস্থিত, এমনটাই বলছে তারা। গিল্ডের সভাপতি ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে যথাযথ জায়গা থেকে আমাদের কাছে আবেদনপত্র আসেনি, তাই আগ বাড়িয়ে আমরা বাংলাদেশকে স্থান দিতে পারিনি। দেওয়া সম্ভব নয়। তবে, আমরা নিজেরাও খুব বেদনাহত রয়েছি। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন না থাকায় গত বছরের মতো বিশাল ব্যবসা এ বছর হবে না বলেই মনে করছেন প্রকাশকরা। অন্ততপক্ষে ২০ শতাংশ বিক্রি কম হবে।
তবে খ্যাতনামা প্রকাশন সংস্থা দে’জ পাবলিশিং-এর কর্ণধার অপু দে বলছেন, বাংলাদেশ আসছে না মানে সে দেশের বই পাওয়া যাবে না, এমনটা নয়। তবে, হ্যাঁ, বইমেলায় তাদের একটা বড় প্যাভিলিয়ন হয়, সেখানে আমরা অনেক বই আমরা একসঙ্গে দেখতে পাই। সেটা এই মুহূর্তে হয়ে উঠবে না। তবে, বাংলাদেশের বই কলেজ স্ট্রিট বইপাড়াতে অনেকটাই সহজলভ্য। তবুও বইমেলার মাঝে এ যেন এক অন্য বিষাদ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

