স্মরণ সৌরভে ‘সোনালী কাবিন’-এর কবি

ইমরান রহমান

স্মরণ সৌরভে ‘সোনালী কাবিন’-এর কবি

কবির মৃত্যুর খবরের আকস্মিকতায় কিছুটা সময় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলাম। তবে অচিরেই সম্বিৎ ফিরে এলে মনের আয়নায় ভেসে উঠতে থাকে একের পর এক ছবি—গুলশানের সেই বাসা—কেয়ারি শান, তার ছেলে কিংবা নাতনি পরিবেশিত গরম চায়ের ধোঁয়ায় উড়ে যাওয়া সেই সব বিকেল! কতজনের সঙ্গেই তো জীবনে দেখা হলো! তাদের নাম-ঠিকানা আজ আর মনে নেই। ঢেউয়ের মতো সেই সব মানুষের আসা-যাওয়ার বিরামহীন ভিড়ের মাঝেও কারো কারো সংস্পর্শ বিস্তীর্ণ তীরের মতো স্মৃতিতে স্থির হয়ে থাকে। তাদের সঙ্গে পরিচয় যেমন মানবদেহের আড়ালে লুকানো কোনো শুকপাখি, দুর্গম পাহাড়ি ঝরনার সঙ্গে সাক্ষাৎ, তেমনি দৈহিক অনুপস্থিতির মাঝে তাদের প্রবল আত্মিক উপস্থিতি যেন হাওয়ায় ফিরে আসা পুষ্প সুরভি। তাদের ভুলতে গেলে ভুলে যেতে হয় নিজেকেই। মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ এমনই একজন।

বাংলা সাহিত্যের এই কিংবদন্তি কবির কাছে আমার ঋণ অনেক; কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। পিতৃতুল্য স্নেহ আর বন্ধুসুলভ হাস্যরসে ভরপুর তার স্মৃতিগুলো আমাকে তাড়া করবে জীবনের বাকি দিনগুলোয়ও। এজন্য অবশ্যই দৈনিক আমার দেশ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। পত্রিকাটির তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক কবি হাসান হাফিজ ভাইয়ের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। হাফিজ ভাই আমাকে ২০০৭ সালে প্রায়ান্ধ এই কবির সাপ্তাহিক কলাম ‘সাহসের সমাচার’ অনুলিখনের দায়িত্ব দেন। ২০১৩ সালে স্বৈরাচারের রোষানলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহেই আমাকে যেতে হতো তার কাছে।

বিজ্ঞাপন

পরিচয়ের প্রথম দিনেই ছোটখাটো দৈহিক গড়নের গৌরবর্ণের মানুষটি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—কবিত্ব একটি সহজাত ক্ষমতা, উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নিয়ে কেন এটি অর্জন করা যায় না; কেন হাজার তত্ত্ব মুখস্থ করেও সবাই কবি নয়; কেন ‘সোনালী কাবিন’ আর ‘কালের কলস’ সাহিত্যের অমূল্য রত্ন। ‘সাহসের সমাচার’-এর অনুলিখন শুরুর প্রথম বাক্যটিই আমাকে বিস্মিত করে যখন কবি বললেন, ‘লিখো, লেখা কোনো তরল পদার্থ নয় যে ঢেলে দিলেই চুইয়ে চুইয়ে পড়বে।’ মজার বিষয় হলো, সেদিনের এই লেখার শিরোনামও বোধ করি এটিই ছিল! আসলেই লেখা অনেক কঠিন বিষয়! এটি আমি একাধিকবার কবির লেখা তুলতে গিয়েই বুঝেছি। তখনো কম্পিউটারে লেখালেখিতে দক্ষ নই। ফলে কাগজ-কলমের কায়িক পরিশ্রম কিছুটা সইতেই হতো। তবে তার লেখার অনুলিখন করতে গিয়ে কখনোই ক্লান্ত হতাম না; বরং প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে তিনি আমাকে দৃশ্যমান জগতের বাইরে যে জগতে নিয়ে যেতেন সেখানে এ ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। এ অবস্থায় যখন আরো কিছুক্ষণ লেখার জন্য আগ্রহী ও কৌতূহলী হয়ে উঠতাম, তখনই হয়তো কবির লেখা শেষ। আরেকটু লেখার তাগাদা দিলে বলতেন, ‘আরে মিঞা, লেখা বড় হলে ঝুলে যায়, পাঠক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।’ একটি সিঙ্গল কলাম তুলতে কোনো সপ্তাহে আমাকে তার কাছে দুবারও যেতে হয়েছে। বর্তমান ‘চ্যাটজিপিটি’ প্রজন্মের কবি-লেখকদের ক্ষেত্রে তার এসব বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হালের চ্যাটজিপিটি প্রজন্মের কাব্য ও সাহিত্যচর্চা দেখে মনে হয় না লেখা কোনো কঠিন পদার্থ। প্রযুক্তি ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’ মার্কা এই প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। তারা চাইলেই যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক লেখা পানির মতো ঢেলে দিতে পারে অনায়াসে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে মুহূর্তেই ফেসবুক এমনকি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীগুলো নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে নির্দ্বিধায়, নির্বিচারে। সবাই যেন কবি ও লেখক! সময় আর শ্রম বাঁচানোর লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবিষ্কার হয়েছিল সহায়ক শক্তি হিসেবে। অথচ এটিই এখন আমাদের মূল শক্তি হয়ে গেছে। খোদাপ্রদত্ত মস্তিষ্ক গৌণ হয়ে পড়ছে। আমরা কি ধীরে ধীরে চিন্তাশক্তিহীন হয়ে পড়ব—এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। এতে কি প্রকৃত কবি-লেখকদের নিরলস সাধনা ও কালজয়ী সৃষ্টি হুমকির মুখে পড়বে না?

কবির স্বীকৃতি বা পুরস্কার যা-ই বলি না কেন, তা কিন্তু দিনশেষে পাঠকের সম্মান আর ভালোবাসাই। এটি অর্জন করতে গিয়ে একজন কবিকে আজীবন ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। সেক্ষেত্রে শুধু তিনিই জানেন যাকে হারাতে হয় অনেক কিছু—যৌবন, প্রিয় মুখ, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, কখনো কখনো প্রাপ্য সম্মানটুকুও। এসবই আল মাহমুদের জীবনে ছিল নিত্যসঙ্গী। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘কবির ঘরে যখন পুরস্কার ঢোকে তখন কবির লাশ বেরিয়ে যায় গোরস্থানের দিকে।’ ...‘আরে ভাই, কত চারণের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, প্রেম হয়েছে, প্রকৃতির সমস্ত প্রসঙ্গের সাথে বাকবিনিময় হয়েছে, গাছের সাথে, মাছের সাথে—এগুলো পুরস্কারের চেয়ে কম কীসের?’

কবি ছিলেন মিতাহারী; কিন্তু সুখাদ্য বা মোগলাই খাবারের প্রতি তার একটা ঝোঁক ছিল। পুরোনো ঢাকায় কোথায় তখনো গ্লাসি কিংবা বাহারি পদের কাবাব বিক্রি হতো তার তথ্য জানতে চাইতেন আমার কাছে প্রায়ই। খাবারও যে একটা দর্শন, সেটিও তিনি তার লেখায় বিভিন্নভাবে উপজীব্য করে তুলতে চেয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে আল মাহমুদকে দাফন করা উচিত ছিল কি না, সে নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। তবে এটুকু বলতে পারি, তিনি আমাদের সংকীর্ণ রাজনীতির শিকার না হলে তার জীবনের শেষ দিনগুলো আরো শান্তিপূর্ণ ও অধিকতর আর্থিক সচ্ছলতায় কাটতে পারত। তাকে যখন একবার জিজ্ঞেস করি, ‘তিনি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের কি না,’ তার উত্তর তিনি দিয়েছিলেন—‘ইমরান, একজন সত্যিকারের কোনো কবি নির্দিষ্ট সীমানার জন্য জন্মায় না। তার পরিচয় স্থান-কাল-পাত্রের সীমা অতিক্রম করে।’ কবি ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। একজন জাত কবির জন্য পৃথিবী শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষা করে, কক্ষপথে অবিরাম ঘুরে বেড়ায়। জার্মান কবি হোমারকেও জীবদ্দশায় জীবিকার জন্য দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে হয়েছিল; কিন্তু হোমারের মৃত্যুর পর প্রতিটি ইউরোপীয় দেশ তার মরদেহের দাবি নিয়ে টানাটানি করেছিল। আমাদের আল মাহমুদও মহাকালের যাত্রী। ওপারে ভালো থাকুন, স্যার।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন