ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। বেকারত্ব, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা একসঙ্গে মোদি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
শিক্ষার্থী ও তরুণদের ক্ষোভ থেকে আন্দোলন
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম ও পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। এ নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। হতাশার জেরে কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
এরপর বেকার তরুণদের নিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতির অবমাননাকর মন্তব্য নতুন করে ক্ষোভ উসকে দেয়। সবশেষে নির্বাচন কমিশনের ভেতর থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার বিষয়টি আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়।
দুই নির্বাচন কমিশনার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। লেখকের দাবি, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফলে এসব পদক্ষেপ বিজেপির পক্ষে প্রভাব ফেলেছিল।
রাজধানী দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার
আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে আধাসামরিক বাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরাপত্তা সদস্যদের আনা হয়েছে। পাকিস্তান সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী কিছু বাহিনীকেও মোতায়েন করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের একটি অংশ নিজেদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত করছে। এ আন্দোলনে প্রধানত হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণেরা অংশ নেওয়ায় সরকার কঠোর বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জটিলতার মুখে পড়েছে। এর আগে ২০২০ সালে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী শাহিনবাগ আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগ ও কোভিড-১৯ মহামারির ভূমিকা ছিল।
বিরোধীদের জন্যও রাজনৈতিক সুযোগ
আন্দোলনের প্রতি বিভিন্ন বিরোধী দলের সমর্থন বাড়ছে। তবে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা রয়েছে। বিশেষ করে আগামী বছরের পাঞ্জাব নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাড়তে পারে।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৩ সালে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক প্রচার শুরু হয়েছিল, বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে তার যোগসূত্র রয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিবর্তন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি সমালোচিত হয়েছে। এসব পরিবর্তন নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারের প্রভাব বাড়িয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি কী?
আন্দোলনকারীদের বেশ কিছু দাবির মধ্যে রয়েছে—
• ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
• নারীদের জন্য মন্ত্রিসভায় ৫০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ এবং সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো।
• মোদির ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা।
• দলবদলকারী সংসদ সদস্য ও বিধায়কদের দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও সরকারি পদে থাকার অযোগ্য ঘোষণা করা।
• রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
মোদির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ
তরুণদের এই আন্দোলন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী—উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। আন্দোলনকারীরা নির্বাচনী স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মতো ইস্যুকে সামনে এনেছেন।
তবে বিরোধী দলগুলো নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকলে আন্দোলনের রাজনৈতিক সম্ভাবনা দুর্বল হতে পারে। গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রশ্নে বিরোধীদের পারস্পরিক অবিশ্বাস কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

