বাংলাদেশে চাইলেই কি শিশুর ডিএনএ টেস্ট করা যায়

বাংলাদেশে চাইলেই কি শিশুর ডিএনএ টেস্ট করা যায়

নিজের সন্তান দাবি করে এক নারীর ডিএনএ পরীক্ষার দাবি ঘিরে আলোচনায় ‘মিঠাই’ নামের একটি শিশু। তবে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ইচ্ছায় পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করার সুযোগ নেই। এ জন্য প্রয়োজন পুলিশি তদন্ত কিংবা আদালতের নির্দেশ।

বিজ্ঞাপন

বাদামি চুল ও ফর্সা গড়নের ছোট্ট শিশুটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই চেনেন ‘মিঠাই’ নামে। ফেসবুকে ‘মিঠাই’ নামের একটি পেজে শিশুটির বেড়ে ওঠা, বিভিন্ন বয়সের ছবি ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড নিয়মিত প্রকাশ করেন তার মা। পেজটিতে শিশুটির মায়ের ব্যবসার প্রচারণামূলক ভিডিওও দেখা যায়।

তবে সম্প্রতি শিশুটিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক নারী শিশুটিকে নিজের সন্তান দাবি করে তার ডিএনএ পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, শিশুটির বর্তমান পরিবার ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার মধ্যে সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশে কেউ চাইলেই কি শিশুর পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করাতে পারেন?

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যক্তিগতভাবে চাইলেই এ ধরনের ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করানোর সুযোগ নেই। এ জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। পুলিশি তদন্ত বা আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতেই নির্ধারিত সরকারি পরীক্ষাগারগুলোতে এ পরীক্ষা করা হয়।

শিশুটিকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিখোঁজের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান এবং এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘আমার সন্তান কোথায়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করে বেসরকারি সংস্থা জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন।

সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ শিশুদের কয়েকটি পরিবার অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ছিল ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের একটি নিখোঁজ শিশুর পরিবার। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাসার সামনে খেলতে গিয়ে শিশুটি নিখোঁজ হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শিশুটির বাবা ৯১৫ দিন লেখা একটি কার্ড হাতে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়। পরিবারের অভিযোগ, পরে ‘মিঠাই’ নামে টিকটকে শিশুটিকে দেখতে পান তারা। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পরিবারটির দাবি, শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় করা মামলা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে গেলেও তার সন্ধান মেলেনি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটিকে নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হলে ওই নারী শিশুটিকে নিজের সন্তান দাবি করে ডিএনএ পরীক্ষার দাবি জানান। পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগও তোলেন তিনি।

কামরাঙ্গীর চর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন বলেও জানান তিনি। পরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার থানায় ওই নামে কোনো নিখোঁজ শিশুর তথ্য বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, খিলগাঁও থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় ওই থানায় মামলা বা জিডি হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তিনি তখন ওই থানায় যোগ দিয়েছেন মাত্র ১২ দিন আগে। বিষয়টি যাচাই করতে প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানোর অনুরোধ জানান তিনি।

শিশুটির বর্তমান পরিবারের বক্তব্য কী

শিশুটির বর্তমান মা ‘মিঠাই’ নামের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, প্রায় দেড় বছর ধরে ওই নারী তাদের পরিবারকে হয়রানি করছেন। শিশুটিকে নিজের সন্তান দাবি করার পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ওই নারী দেখাতে পারেননি বলেও দাবি করেন তিনি।

ভিডিওতে শিশুটির মা বলেন, একটি শিশুকে ঘিরে এমন বিরোধ তার ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আরো দাবি করেন, কামরাঙ্গীর চরের শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার অনেক আগেই তার সন্তানের জন্ম হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির জন্ম ২০২১ সালের জুলাইয়ে এবং একই বছরের অক্টোবরের দিকে ‘মিঠাই’ নামের ফেসবুক পেজটি খোলা হয়।

পেজে শিশুটির জন্মের পর থেকে বিভিন্ন বয়সের ছবি ও ভিডিও রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি, কামরাঙ্গীর চরের শিশুটি ২০২৪ সালের ৫ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার দাবি করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ওই ঘটনার তিন দিন আগে, অর্থাৎ ২ মার্চ, কীভাবে তিনি শিশুটির ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। তবে এ ঘটনায় নিজের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও শিশুটিকে নিজের সন্তান দাবি করা ওই নারীর সাড়া পাওয়া যায়নি।

ডিএনএ পরীক্ষা কী, কীভাবে করা হয়

ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হলো জীবের বংশগত তথ্য বহনকারী জৈব উপাদান। সন্তানের ডিএনএর একটি অংশ মায়ের কাছ থেকে এবং অন্য অংশ বাবার কাছ থেকে আসে। এই বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে পিতৃত্ব বা মাতৃত্বের সম্পর্ক যাচাই করা সম্ভব।

সাধারণত গালের ভেতরের কোষ থেকে সোয়াবের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর নমুনা থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের তুলনা করা হয়।

তবে ডিএনএ পরীক্ষা শুধু পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্যই ব্যবহৃত হয় না। অপরাধের তদন্ত, অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন বংশগত রোগ বা জিনগত ত্রুটি নির্ণয়েও এ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান জানান, ডিএনএ পরীক্ষা সাধারণত দুই ধরনের—ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা এবং ডায়াগনস্টিক ডিএনএ পরীক্ষা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যা বা ধর্ষণের মতো অপরাধের তদন্ত কিংবা অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। অন্যদিকে, জিনগত ত্রুটি বা নির্দিষ্ট রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করার জন্য ডায়াগনস্টিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এ ধরনের পরীক্ষা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও করা সম্ভব।

বাংলাদেশে কোথায় করা যায় পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের পরীক্ষা

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে।

প্রতিষ্ঠান দুটি হলো—

১. পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষাগার।

২. মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি।

আবু সুফিয়ান বলেন, কোনো শিশুর বাবা-মায়ের পরিচয় বা পিতৃত্ব-মাতৃত্বের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হলে এসব সরকারি পরীক্ষাগারের মাধ্যমে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি গিয়ে এ পরীক্ষা করানোর সুযোগ নেই।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুলিশি মামলা বা আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতেই এসব পরীক্ষাগার পরীক্ষা করে থাকে। কারণ, পরীক্ষাগারগুলো মূলত আইনগত ও ফরেনসিক প্রয়োজনে এ ধরনের পরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত।

ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয়

পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সিআইডির স্পেশাল সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (এসএসপি) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, আদালতের আদেশ ছাড়া সিআইডির পরীক্ষাগারে বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় না।

তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতেই এ ধরনের পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোনো শিশুর পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে পারেন। প্রয়োজনে ঢাকার বিচারিক আদালতের আমলি আদালতেও সরাসরি মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

এরপর আইনগত প্রক্রিয়ায় আদালতের নির্দেশ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি পরীক্ষাগারে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

অর্থাৎ, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি জানানো কিংবা ব্যক্তিগতভাবে সন্দেহ প্রকাশ করলেই ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায় না। এ জন্য অভিযোগের আইনগত ভিত্তি এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।

অন্য ক্ষেত্রেও কি ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়

পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

আবু সুফিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি স্ত্রী ও সন্তানকে নিজের কাছে নিতে চাইলে অভিবাসনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কখনো কখনো ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের নির্দেশনা থাকতে পারে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও দাতা ও গ্রহীতার আত্মীয়তার সম্পর্ক যাচাই করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের নির্দেশনা অনুযায়ী এ পরীক্ষা করা হতে পারে।

শিশুটির পরিচয় নির্ধারণে কী হবে

‘মিঠাই’ নামে পরিচিত শিশুটিকে ঘিরে দুই পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি এখন আলোচনায় রয়েছে। এক পক্ষ শিশুটিকে নিজের সন্তান দাবি করছে, অন্য পক্ষ তা অস্বীকার করছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি, ভিডিও কিংবা কোনো পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে এককভাবে শিশুটির পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এ ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, প্রাসঙ্গিক নথিপত্র যাচাই এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিনগত সম্পর্ক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শিশুটির পরিচয় নিয়ে চলমান বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধানই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...