টানা কয়েক বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের স্বীকৃতি ধরে রেখেছে ইউরোপের নর্ডিক দেশ ফিনল্যান্ড। শীতপ্রধান আবহাওয়া, দীর্ঘ শীতকাল, এমনকি বছরের একটি সময়ে সূর্যালোকের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও দেশটির মানুষ জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট এবং মানসিকভাবে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে যেমন রয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও সামাজিক নিরাপত্তা, তেমনি রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন কিছু জীবনাচরণ ও মূল্যবোধ।
বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন (ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট) অনুযায়ী, ফিনল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটিতে শিক্ষা প্রায় বিনামূল্যে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত এবং কর্মজীবনে পর্যাপ্ত ছুটির সুযোগ থাকায় মানুষের দৈনন্দিন চাপ তুলনামূলক কম। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সরকারি সুবিধাই নয়, ফিনিশদের কিছু জীবনধারাও তাদের সুখী জীবনের অন্যতম ভিত্তি।
আবেগ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা কম
ফিনল্যান্ডের মানুষ নিজেদের অনুভূতি প্রকাশে তুলনামূলক বেশি স্বচ্ছ। ‘আমি ভালো নেই’ এমন কথাও তারা সহজেই বলতে পারেন। দেশটির মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জোর করে ইতিবাচক থাকার ভান না করে নিজের আবেগ প্রকাশ করা মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাতেও দেখা গেছে, আবেগ চেপে রাখা সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল করে এবং মানসিক চাপ বাড়ায়।
কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যে গুরুত্ব
ফিনল্যান্ডে কর্মঘণ্টা সাধারণত যুক্তিসঙ্গত হওয়ায় মানুষ কাজের বাইরে নিজের জন্য, পরিবার ও শখের জন্য পর্যাপ্ত সময় পান। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বা অতিরিক্ত যাতায়াতের চাপও তুলনামূলক কম। ফলে ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মজীবনের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় থাকে।
প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক
ফিনল্যান্ডে প্রকৃতি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশটির ‘এভরিম্যানস রাইট’ নীতির কারণে প্রায় সব বন, হ্রদ ও উন্মুক্ত প্রাকৃতিক এলাকায় বিনা খরচে ঘোরাফেরা, ক্যাম্পিং, হাঁটা, সাঁতার, বেরি বা মাশরুম সংগ্রহসহ বিভিন্ন কার্যক্রম করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির সংস্পর্শ মানসিক চাপ কমায় এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি বাড়াতে সহায়তা করে।

নতুন কিছু শেখার আগ্রহ
ফিনিশ সমাজে নতুন দক্ষতা অর্জনকে উৎসাহ দেওয়া হয়। নতুন ভাষা শেখা থেকে শুরু করে রান্না, মৃৎশিল্প, যোগব্যায়াম কিংবা নৌচালনার মতো বিভিন্ন বিষয়ে শেখার সুযোগ সহজলভ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কিছু শেখা আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক সম্পর্ক
ফিনল্যান্ডে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের মাত্রা অনেক বেশি। ছোট জনসংখ্যার কারণে সামাজিক যোগাযোগও দৃঢ়। গবেষণা বলছে, একাকীত্ব জীবনসন্তুষ্টির অন্যতম বড় বাধা। তাই পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া ফিনিশদের সুখী জীবনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সুখ নয়, জীবন নিয়ে সন্তুষ্টিই মূল লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিনল্যান্ডের মানুষ তীব্র উচ্ছ্বাস বা ক্ষণস্থায়ী আনন্দের পেছনে ছুটে না। বরং তারা জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তি ও স্থিতিশীলতাকে মূল্য দেন। এক কাপ ভালো কফি, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা শান্ত একটি দিন এসবের মধ্যেই তারা সন্তুষ্টি খুঁজে পান। তাদের কাছে সুখ মানে স্থায়ী জীবনসন্তুষ্টি, ক্ষণিকের উচ্ছ্বাস নয়।
সূত্র: হাফপোস্ট
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


