ভারতের উত্তর প্রদেশের সম্ভলের মহল্লা কোট এলাকা জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এখানকার ঐতিহাসিক শাহী জামে মসজিদের কাছে কবরস্থানের জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে জেলা প্রশাসন ২২টি বাড়ি ও দোকান ভেঙে ফেলার নোটিশ জারি করেছে। কবরস্থানের জমিকে সরকারি জমি বলা হচ্ছে। গত শুক্রবার মোট ৪৮ জনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই মুসলিম বাসিন্দা ও ছোট ব্যবসায়ী। ১৫ দিনের মধ্যে নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়েছে, অন্যথায় বুলডোজার দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
নোটিশে বলা হয়, কবরস্থান হিসেবে রেকর্ড করা জমির জরিপ ও পরিমাপ করার কয়েকদিন পর। কর্মকর্তারা পরে ঘোষণা করেন কবরস্থানের জমিতে ২০টি বাড়ি এবং দোকান নির্মিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে দখলদারদের আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়।
এ পদক্ষেপ স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, তারা বলছেন পরিবারগুলো কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাস করছে, প্রশাসনের বিরুদ্ধে তাড়াহুড়ো করে কাজ করার অভিযোগ তুলেছে।নোটিশপ্রাপ্তদের একজন ওয়াসিম খান বলেন, আমাদের নিজস্ব জমিতে বাড়ি তৈরি অথচ আমাদের সঙ্গে অপরাধীদের মতো আচরণ করা হচ্ছে। আমাদের প্রবীণদের এখানে কবর দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের বাড়িগুলো বছরের পর বছর ধরে এখানে রয়েছে। আমাদের জমিই কবরস্থানের দান করা হয়েছে।
নোটিশ অনুসারে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে, যার মধ্যে রয়েছে বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস। বাসিন্দারা বলছেন, বুলডোজার শব্দই আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। মানুষ রাতে ঘুমাচ্ছে না। মহিলা এবং শিশুরা ভীত যে বুলডোজারগুলো সতর্কতা ছাড়াই চলে আসবে।’
বিনোদন জগতের দুই তারকা পায়েল এবং মান্নারা সম্প্রতি ওই এলাকার মুসলিম ধর্মীয় স্থান পরিদর্শন করেছেন, তাদের ছবি নিয়ে কিছু হিন্দু সংগঠন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বলে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে মুসলমানরা নিজেদের একাকী বোধ করছেন।
মহল্লা কোটের বাসিন্দা মুহাম্মদ সালমান বলেন, এটা শুধু জমি পরিমাপের ব্যাপার নয়। মনে হচ্ছে আমাদের সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে। এটা যদি কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় হত, তাহলে আমাদের কথা সঠিকভাবে শোনার আগে বুলডোজার চালানোর কথা কেন?
এর আগে, ইলাহাবাদ হাইকোর্ট সম্ভল জেলার কোট (আন্দর চাঙ্গি) গ্রামে কবরস্থানের জমির পরিমাপ ও জরিপ স্থগিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বিচারপতি রাজীব মিশ্র এবং সত্যবীর সিংয়ের একটি ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, আবেদনকারীরা প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজস্ব দলের সামনে তাদের আপত্তি জানাতে পারেন।
ওয়াসিম খানসহ ১৭ জন ব্যক্তি এ আবেদন দায়ের করেন, যারা সম্ভল সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খাতা নং ২/৩২ জরিপের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আবেদনকারীরা বলেছেন, জমিটি একটি কবরস্থান হিসাবে রেকর্ড করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু একটা দিকে আমরা বাস করি। তারা যুক্তি দিয়েছেন যে এ ধরনের সম্পত্তির ওপর যে কোনো পদক্ষেপ সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশের বিরুদ্ধে যাবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতকে বলেন, জমিটি ইতিমধ্যেই সরকারি রেকর্ডে কবরস্থান হিসেবে নিবন্ধিত এবং প্রশাসন কেবল সীমানা পরিমাপ এবং চিহ্নিত করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, কেন কেবল জামে মসজিদের কাছে মুসলিম বাড়ির আশেপাশেই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা আলোচনা করা হচ্ছে। সমাজকর্মী শাহনওয়াজ আলমের প্রশ্ন ‘যদি জমিটি সংবেদনশীল হয়, তাহলে এতদিন ধরে অনুমতি কেন দেওয়া হয়েছিল? এখন কেন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং কেবল এখানেই?’
স্থানীয় মুসলিম নেতারা স্বচ্ছতা এবং সংযমের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা আইন এবং আদালতকে সম্মান করি। আমরা কেবল ন্যায় এবং সময় চাই।’
জামে মসজিদের সঙ্গে যুক্ত এক মাওলানা রশিদ বলেন, ‘যথাযথ শুনানির আগে বুলডোজারের হুমকি আস্থার ক্ষতি করে। অনেক বাসিন্দা নথিপত্র প্রস্তুত করছেন আবার অন্যরা আশঙ্কা করছেন- কাগজপত্র তাদের বাড়ি বাঁচাতে পারবে না।
ওয়াসিম খান আরেকজন বলেন, আমরা ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি কিন্তু ন্যায়বিচারে ভয় এবং মাথার ওপর বুলডোজার ঝুলিয়ে আসা উচিত নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

