নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

চীনের বন্ধুত্ব চান ট্রাম্প, উদ্বিগ্ন ভারত

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

চীনের বন্ধুত্ব চান ট্রাম্প, উদ্বিগ্ন ভারত

গত সপ্তাহে বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জিনপিংকে ‘মহান নেতা’ ও ‘বন্ধু’ বলে অভিহিত করেন তিনি।

চীন সফর শেষে এশিয়ার অন্য কোথাও না থেমে দেশে ফিরে যান ট্রাম্প। সফর চলাকালীন ও পরবর্তী সাক্ষাৎকারে তিনি এই অঞ্চলের মার্কিন মিত্র বা অংশীদারদের বিষয়ে কোনো আশ্বস্তকারী মন্তব্য করেননি। তবে তিনি তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন বলে জানান। তার এই বক্তব্য এশিয়াজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উদ্বেগকারীদের মধ্যে ভারতীয় নেতারাও রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এশিয়া নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে তার সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের পরিবর্তে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরের আয়োজন করেছেন তারা। রুদ্ধদ্বার কূটনৈতিক আলোচনা এবং ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের পরিকল্পনাসহ চারদিনের এই সফরটি শনিবার কলকাতায় মাদার তেরেসা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে একটি সংক্ষিপ্ত সফর এবং দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে শুরু হয়।

বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, রুবিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মোদিকে হোয়াইট হাউস সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং দুই কর্মকর্তা বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো গভীর করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

রুবিও তার পুরো সফরজুড়ে প্রশাসনের এশিয়া নীতি ব্যাখ্যা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্পষ্ট ইচ্ছা হলো জিনপিংয়ের অংশীদার হওয়া এবং চীনকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ কমিয়ে আনা।

রুবিও ভারতে গিয়েছেন ট্রাম্পের হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে। গত গ্রীষ্মে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করতে অস্বীকার করেন। এরপর ট্রাম্প উচ্চ শুল্ক আরোপ করে দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাম্প দাবি করেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ মধ্যে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

এখন তাদের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে: ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করায় ট্রাম্প পাকিস্তানি নেতাদের প্রশংসা করেছেন।

ভারত ও চীনের প্রতি ট্রাম্পের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি, তার প্রথম মেয়াদের সম্পূর্ণ বিপরীত।

২০০০-এর দশক থেকে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক নীতি নির্ধারকরা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। এর দুটি উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, চীনের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার জন্য একজন সহযোগী নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা সহায়তার জন্য রাশিয়ার ওপর দিল্লির নির্ভরশীলতা কমানো।

ট্রাম্প সেই ধারাকে উল্টে দিয়েছেন। আর এর একটি আশ্চর্যজনক পরিণতি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমে যাওয়ায় ভারতীয় কর্মকর্তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার জন্য আরো বেশি চেষ্টা করছেন।

বেইজিংয়ের বাসিন্দা এবং ভারত ও চীন বিষয়ক একটি বইয়ের লেখক অনন্ত কৃষ্ণান বলেন, ‘ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান গতিপথ এবং যেভাবে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘যদিও আমি বিশ্বাস করি যে, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক রয়েছে, তবুও এটি লক্ষণীয় যে, এই অঞ্চলে ভারতকে একটি প্রধান সহযোগী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আখ্যানটি সরে গেছে।’

প্রকৃতপক্ষে, চীন ও রাশিয়ার নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরেই ট্রাম্পের এক ধরনের সখ্যতা রয়েছে। তিনি কর্তৃত্ববাদী নেতাদের প্রশংসা করে থাকেন। ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, প্রায় ছয় ফুট লম্বা জিনপিংকে দেখতে ‘সেন্ট্রাল কাস্টিং’ থেকে উঠে আসা কোনো চরিত্রের মতো লাগে। তিনি আরো বরেন, ‘তার মতো ব্যক্তি আপনি খুঁজে পাবেন না।’

মোদি একটি গণতান্ত্রিক দেশকে নেতৃত্ব দেন, যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন যে তিনি কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতিতে শাসন করার চেষ্টা করেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মনে হয়েছিল, এই জনতুষ্টিবাদী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন জয় করে নিয়েছেন। ২০২০ সালে মোদি ভারতে এক লাখ ১০ হাজার আসনের একটি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ট্রাম্পের জন্য প্রচারণামূলক সমাবেশের আয়োজন করেন, যা ছিল হিউস্টনে ‘হাউডি, মোদি!’ সমাবেশের অনুরূপ। আহমেদাবাদে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ থেকে ভারত আমাদের হৃদয়ে সর্বদা একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে থাকবে।’

কিন্তু গত জুনে এক ফোনকলে মোদি জোর দিয়ে বলেন, ভারত ও পাকিস্তান ট্রাম্পের সাহায্য ছাড়াই নিজেদের সংকট নিজেরাই সমাধান করেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য উদগ্রীব মার্কিন প্রেসিডেন্ট এতে ক্ষুব্ধ হন।

তিনি দ্রুতই ভারতীয় পণ্য আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছায়, যেখানে ভারতের জন্য কঠিন শর্ত রাখা হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্ট ১০০টিরও বেশি দেশের ওপর ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক বাতিল করে দেয়, যদিও প্রেসিডেন্ট এখনো বিকল্প উপায়ে এই ধরনের কর আরোপের চেষ্টা করছেন।

অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক এবং বাইডেন প্রশাসনে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর মতে, এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ট্রাম্পের জন্য এই সম্পর্ক মেরামতের ভিত্তি স্থাপন করা।

মার্কিন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে লেখা একটি বইয়ের লেখিকা মীনাক্ষী নারুলা আহমেদ বলেন, ‘ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এক অর্থে ছিল বুশ ও ওবামার ভারতপন্থি নীতির ধারাবাহিকতা এবং চীনকে প্রতিহত করার জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার একটি প্রয়াস।’

তিনি আরো বলেন, এখন সমস্যা হলো, ট্রাম্পের বর্তমান সহযোগীরা ভারতকে অনুকূল দৃষ্টিতে দেখেন না।

ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনার কারণে অনেক ভারতীয় কর্মকর্তা বলছেন, দেশটির উচিত তার দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতি মেনে চলা — অর্থাৎ অন্যান্য বিশ্বশক্তিকে দূরে রাখা।

পরের মাসে, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, মার্কিন সরকার ভারতকে একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। তার এই বক্তব্য ভারতীয় কর্মকর্তাদের হতবাক করে দেয়।

তিনি বলেন, ‘ভারতের বোঝা উচিত যে, ২০ বছর আগে চীনের ক্ষেত্রে আমরা যে ভুল করেছিলাম, ভারতের সঙ্গেও আমরা সেই একই ভুল করছি না। দেখা যাবে আমরা তোমাদের বাজার গড়ে তুলতে দেব এবং তারপর তোমরা অনেক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে আমাদের পেছনে ফেলে দেবে।’

গত মাসে, ট্রাম্প একটি ডানপন্থি পডকাস্টের প্রতিলিপি পোস্ট করেন, যেখানে উপস্থাপক মাইকেল স্যাভেজ চীন ও ভারতকে ‘নরকতুল্য’ স্থান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, ওই দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে ‘একীভূত’ হতে পারেনি।

ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করে, ভারত সরকার সামাজিকমাধ্যমে হোয়াইট হাউসের সমালোচনা করার এক বিরল পদক্ষেপ নেয়। এই মন্তব্যগুলোকে ‘স্পষ্টতই অজ্ঞতাপ্রসূত, অনুপযুক্ত এবং কুরুচিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করে।

রুবিওর সঙ্গে আলোচনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবং দেশটির অন্যান্য কর্মকর্তারা তাদের দেশ সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের মূল্যায়ন এবং জিনপিংকে নিয়ে সঙ্গে ট্রাম্পের লক্ষ্য আরো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো তানভি মদন বলেন, ‘বেইজিংয়ের সঙ্গে ‘কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক’ স্থাপনে ওয়াশিংটনের সম্মতির তাৎপর্য তারা বিশেষভাবে বোঝার চেষ্টা করবেন।’

ভারতের বিরুদ্ধে ট্রাম্প পদক্ষেপ নেওয়ার পর দেশটির কর্মকর্তারা চীনের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করছেন। ২০২০ সালে হিমালয় সীমান্তে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের পর তাদের সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। ১৯৬২ সালে বিতর্কিত পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে ভারত ও চীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।

বেইজিং থেকে লেখক কৃষ্ণান বলেন, ‘যদিও আমি মনে করি না যে ভারত-চীন সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, তবে এটা স্পষ্ট যে উভয় দেশই এই সম্পর্কে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চাইছে।’

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন