রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

গুমের সঙ্গে জড়িতরা যত ক্ষমতাবানই হোক, বিচারের মুখোমুখি করা হবে

গুমের সঙ্গে জড়িতরা যত ক্ষমতাবানই হোক, বিচারের মুখোমুখি করা হবে
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গুমের মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেওয়া হয় না, কেড়ে নেওয়া হয় তার প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বস্তি। এটি একটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

রোববার দুপুর পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত এসব অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সব মানুষকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। একই সঙ্গে বছরের পর বছর স্বজনের অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান। গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের রুহের চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন করলেই অনেককে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে, আবার কাউকে গোপনে হত্যা করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুতর অপরাধ অস্বীকার করে গেছে।

তিনি বলেন, বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষকে আমরা ভুলে যাইনি। তাদের পরিবারের প্রতিটি রাত এখনো বুকভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষার মধ্য দিয়ে কাটছে।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে ভিনদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন। তবে দেশে এখনো এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যারা গুম হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় ও হ্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। এর ফলে দেশে ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জাতীয় ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।

রাষ্ট্রপতি এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, একদিন বাংলাদেশেই এসব গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিচার হবে।

তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসা সত্য শুধু বেদনাদায়ক নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং বেছে বেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এসব বর্বর, পৈশাচিক ও ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড বেশি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Victims first, Action now’। গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা এবং গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কাজ স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।

গুমের শিকার ও স্বজনহারা পরিবারগুলোর উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করা পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, তবে সেই ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছে—সেটিই রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তেই আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

রাষ্ট্রপতি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের—সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন—বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে।

তিনি বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব। এ বিষয়ে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

সবশেষে রাষ্ট্রপতি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি, সুশাসনকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, জবাবদিহি ও বাকস্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের শক্তি এবং ইনসাফকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার আলোকিত পথে এগিয়ে যাবে।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন