যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের বোল্ডার শহর ও কাউন্টির করা জলবায়ু মামলা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মামলাটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির জন্য বিশ্বের বড় তেল ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে আর্থিকভাবে দায়ী করা যাবে কি না, তার চেয়েও আগে প্রশ্ন উঠেছে—এ ধরনের মামলা অঙ্গরাজ্যের আদালতে চলতে পারে কি না।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির শুনানি হয়। বোল্ডার কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালে এক্সনমোবিল ও কানাডাভিত্তিক সানকর এনার্জির বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার ব্যয়ও কোম্পানিগুলোর বহন করা উচিত বলে দাবি বোল্ডারের।
বোল্ডারের মামলায় চরম আবহাওয়া, দাবানল, খরা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। শহর ও কাউন্টি কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব ক্ষতির আর্থিক বোঝা ক্রমেই স্থানীয় সরকার ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে।
অন্যদিকে এক্সনমোবিল ও সানকর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি বিষয়, যার প্রভাব অঙ্গরাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। তাই এটি ফেডারেল সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় এবং অঙ্গরাজ্যের আদালতে এ ধরনের মামলা চালানো যায় না। কোম্পানিগুলো এ মামলাকে পরিবেশবাদীদের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে বিচারপতিদের মধ্যে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিছু রক্ষণশীল বিচারপতি মনে করেছেন, বোল্ডারের মামলা অঙ্গরাজ্যের আদালতে চালানোর সুযোগ দিলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মামলা হতে পারে। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসও জানতে চান, বোল্ডার জয়ী হলে দেশের অন্যান্য পৌরসভাও একই ধরনের মামলা করলে পরিস্থিতি কী হবে।
তবে আদালতের কয়েকজন উদারপন্থী বিচারপতি বোল্ডারের যুক্তির প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল অবস্থান দেখিয়েছেন। বিচারপতি এলেনা কাগান মামলাটিকে অতীতের তামাক ও ওপিওয়েড-সংক্রান্ত বড় ধরনের মামলার সঙ্গে তুলনা করেন। অন্যদিকে বিচারপতি কেটানজি ব্রাউন জ্যাকসন মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে আসার সময় হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
মামলাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটোর অংশ না নেওয়া। তিনি সেপ্টেম্বর মাসে মামলাটি থেকে সরে দাঁড়ান। এর ফলে আদালতে ৪-৪ ভোটের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকতে পারে এবং বোল্ডারের মামলা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
বোল্ডারের মামলাটি শুধু একটি স্থানীয় বিরোধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, কাউন্টি ও শহর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায় ৬০টি একই ধরনের মামলা রয়েছে। এসব মামলায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। ফলে বোল্ডারের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অন্য মামলাগুলোর ভবিষ্যতের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে আদালতের সামনে এখনই প্রশ্নটি তেল কোম্পানিগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী কি না, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো বোল্ডারের মামলা অঙ্গরাজ্যের আদালতে এগিয়ে যাওয়ার আইনি সুযোগ পাবে কি না। আদালত যদি মামলাটি চলতে দেয়, তাহলে জলবায়ু ক্ষতির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকারগুলোর ক্ষতিপূরণ দাবি করার পথ আরো প্রশস্ত হতে পারে। আর আদালত যদি মামলাটি আটকে দেয়, তাহলে একই ধরনের বহু মামলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলতি বিচারিক মেয়াদের শেষ দিকে, অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুন বা জুলাইয়ের মধ্যে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, এপিনিউজ, সিবিএস নিউজ ও রয়টার্স
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


