বিদেশিদের কাছে জমি বিক্রির বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনায় বিক্ষোভ

বিদেশিদের কাছে জমি বিক্রির বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনায় বিক্ষোভ

আর্জেন্টিনায় বিদেশিদের কাছে জমি বিক্রির ওপর থাকা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিদেশিদের মালিকানার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার ৮৪ বছর বয়সি রসায়নের অধ্যাপক ও পরিবেশকর্মী মার্তা সাহোরেস রাস্তায় নেমেছিলেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বড় আকারের খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। শ্রমিক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, শিক্ষার্থী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে তিনিও প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন। ‘ক্ষোভ মিছিল’ নামে পরিচিত ওই কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল—‘জমি বিক্রির জন্য নয়।’

বিজ্ঞাপন

আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত চুবুত প্রদেশের এসকেল শহরে মিছিলে অংশ নেন সাহোরেস। সেখানে তিনি দেশের পানিসম্পদ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। সাহোরেস বলেন, ‘বিদেশিরা যখন জমি কেনে, তখন তারা নদী ও হ্রদসহ জমি কিনে নেয়। তারা আমাদের পানি নিয়ে যায়, আমাদের মাটি নিয়ে যায়। আমরা প্রকৃত গণতন্ত্র ও পরিবেশগত সার্বভৌমত্বের পক্ষে।’

মিলেইর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণবিষয়ক ডিক্রির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন সাহোরেস ও তার সহকর্মীরা। বিশেষ করে জমির ওপর সুরক্ষা ও বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন তারা। সাহোরেস বলেন, ‘সৌভাগ্যবশত, আমরা অনেক এবং আমরা লড়াই করি। প্রয়োজন হলে আমরা রাস্তায় থাকি, আবার প্রয়োজন হলে আদালতেও যাই।’

বিদেশিদের মালিকানা নিয়ে উদ্বেগ

আর্জেন্টিনায় জমির অধিকার এখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। দেশটির প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ হেক্টর জমি বিদেশিদের মালিকানায় রয়েছে। এটি দেশটির মোট ভূমির প্রায় ৫ শতাংশ। আয়তনের দিক থেকে এই জমির পরিমাণ প্রায় ইংল্যান্ডের সমান। মিলে-ইর সরকার বিদেশি মালিকানার ওপর থাকা বিধিনিষেধ আরো শিথিল করতে চাইছে। সরকারের যুক্তি, এতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, জমি বিক্রির সুযোগ বাড়ানো হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু কৃষিজমিই নয়, নদী, হ্রদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশেষ করে প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলে এই আশঙ্কা বেশি। বিস্তীর্ণ এই এলাকায় পানি, বন ও খনিজ সম্পদের পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমিও রয়েছে। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, বিদেশি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের হাতে জমির মালিকানা চলে গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকার দুর্বল হয়ে পড়বে।

মিলেইর বিনিয়োগ নীতি

প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ ও বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ তার অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সরকার মনে করে, জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিধিনিষেধ কমানো হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আর্জেন্টিনায় আরো বেশি অর্থ বিনিয়োগ করবেন। এতে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে পরিবেশকর্মী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর নামে পরিবেশ ও ভূমির সুরক্ষা দুর্বল করা উচিত নয়। তাদের আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণ কমানো হলে বড় খনি, কৃষি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে পানি সরবরাহ, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায়।

‘জমি বিক্রির জন্য নয়’

এসকেলসহ চুবুত প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীরা বলছেন, ভূমি শুধু একটি বাণিজ্যিক সম্পদ নয়। এর সঙ্গে পানি, পরিবেশ, স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রা জড়িত। সাহোরেসের মতো আন্দোলনকারীরা মনে করেন, বিদেশি মালিকানার সুযোগ বাড়ানোর আগে স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তাদের বক্তব্য, সরকারের অর্থনৈতিক নীতির কারণে যদি নদী, হ্রদ ও বিস্তীর্ণ ভূমি বিদেশি মালিকানায় চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এসব সম্পদের ওপর স্থানীয় মানুষের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। এই কারণেই তাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্লোগান—‘জমি বিক্রির জন্য নয়।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন