মহাকাশে আয়না বসিয়ে রাতেও রোদ বিক্রির পরিকল্পনা

মহাকাশে আয়না বসিয়ে রাতেও রোদ বিক্রির পরিকল্পনা
ছবি: সংগৃহীত

রাতের অন্ধকারে সূর্যের আলো পৌঁছে দিতে মহাকাশে বিশাল আয়না বসানোর পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মহাকাশ স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে হাজার হাজার আয়না-উপগ্রহ স্থাপন করে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করা এবং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট এলাকায় সেই আলো পৌঁছে দেওয়া। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, দুর্যোগকবলিত এলাকায় আলোর ব্যবস্থা করা এবং রাতের উদ্ধার অভিযান সহজ করাসহ বিভিন্ন কাজে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

বিজ্ঞাপন

তবে মহাকাশে এত বিপুলসংখ্যক আয়না-উপগ্রহ স্থাপন এবং রাতের আকাশে কৃত্রিম আলো ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদেরা। তাদের আশঙ্কা, এ উদ্যোগের ফলে আলোকদূষণ বাড়বে, ব্যাহত হবে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্র এবং মানুষের ঘুমের জৈবিক ছন্দেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রিফ্লেক্ট অরবিটাল জানিয়েছে, এ প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য ভারতের মহাকাশ প্রতিষ্ঠান ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ‘ইয়ারেন্ডিল-১’ নামে প্রথম পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হবে। এর আগে গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের অনুমোদন দেয়।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৪৫ কিলোমিটার উচ্চতায় পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ১৮ মিটার বাই ১৮ মিটার আকারের বিশাল প্রতিফলক আয়না স্থাপন করা হবে। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরও এসব আয়নার অবস্থান ও অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করা সম্ভব হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি আয়না প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আলো ফেলতে পারবে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

এ সেবা পেতে গ্রাহকদের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পছন্দের এলাকার জন্য আলোর বরাত দিতে হবে। অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত স্থানে আলো পৌঁছে দিতে মহাকাশে থাকা আয়না-উপগ্রহগুলোর অবস্থান ও দিক পরিবর্তন করবে প্রতিষ্ঠানটি।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে ৫০ হাজার আয়না-উপগ্রহ পাঠাতে চায় রিফ্লেক্ট অরবিটাল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, শুরুতে এসব আয়নার প্রতিফলিত আলো পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মতো হবে। তবে উপগ্রহের সংখ্যা বাড়লে আলোর তীব্রতা ও স্থায়িত্ব আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। কৃষিজমিতে আলো সরবরাহ, নষ্ট হয়ে যাওয়া সড়কবাতির বিকল্প ব্যবস্থা এবং সামরিক অভিযানে সৌরশক্তি জোগানোর মতো কাজেও এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছে তারা।

সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলের লোন পাইনের কাছে মাউন্ট হুইটনির আশপাশে এ প্রযুক্তির একটি প্রদর্শনী চালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত ওই পরীক্ষায় মরুভূমির একটি এলাকায় শক্তিশালী কৃত্রিম আলো ফেলা হয়। রাতের অন্ধকারে হঠাৎ তীব্র আলো দেখে বিস্মিত হন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের একজন আলোটিকে ‘চোখধাঁধানো’ বলে বর্ণনা করেন।

রিফ্লেক্ট অরবিটালের মুখপাত্রের দাবি, রাতের অন্ধকারে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোই এ সেবার প্রথম গ্রাহক হতে পারে। উদ্ধার অভিযানে এ প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করতে পারে, তা তুলে ধরতেই ওই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল।

আলোকদূষণ ও প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে শঙ্কা

প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ বায়ুমণ্ডলে আলোর বিচ্ছুরণ। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসার সময় বায়ুর অণু ও অ্যারোসল কণার সঙ্গে সংঘর্ষে ছড়িয়ে পড়বে। ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর পরও আলোর একটি অংশ প্রতিফলিত হয়ে আবার বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে শুধু নির্ধারিত এলাকাই নয়, এর আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও আলোকিত হয়ে উঠবে।

গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, মূল আলোকিত এলাকা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরেও এ আলোর তীব্রতা পূর্ণিমার চাঁদের আলোর চেয়ে বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, যারা অর্থের বিনিময়ে এ সেবা নেবেন না, তাদেরও অনিচ্ছায় কৃত্রিম আলোর প্রভাবের মধ্যে পড়তে হতে পারে।

প্রকল্পটির বিরোধিতায় গত আগস্টে পরিবেশবিষয়ক আইনি সংস্থা আর্থজাস্টিসের মাধ্যমে চারটি সংগঠন এফসিসির কাছে অনুমোদন পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে। আর্থজাস্টিসের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জ্যান হ্যাসেলম্যান এ পরিকল্পনাকে ‘নির্বোধ’ ও ‘পাগলামি’ বলে সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, পৃথিবীর সব প্রাণীর বিবর্তন দিন ও রাতের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হয়েছে। সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। ৫০ হাজার আয়না-উপগ্রহ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মানুষের পরিচিত রাতের আকাশ চিরতরে বদলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিজ্ঞানীদের মতে, পাখি, পোকামাকড় ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্য সংগ্রহ, আশ্রয় নেওয়া এবং প্রজননের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম দিন-রাতের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। রাতের অন্ধকারে কৃত্রিম আলোর মাত্রা বেড়ে গেলে এসব প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও জীবনচক্র ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে মানুষের ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিও এ প্রযুক্তি নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি প্রতিফলিত তীব্র আলোর দিকে তাকালে চোখের ক্ষতি হতে পারে।

এ ছাড়া পৃথিবীর কক্ষপথে ক্রমবর্ধমান উপগ্রহের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স কক্ষপথে ১০ লাখ ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এর সঙ্গে হাজার হাজার আয়না-উপগ্রহ যুক্ত হলে রাতের আকাশে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি মহাকাশে আবর্জনার পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন সমালোচকেরা।

বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়েও বিতর্ক

রিফ্লেক্ট অরবিটালের যুক্তি, রাতের বেলায় সৌর প্যানেলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় বাড়বে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে, যা পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

তবে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একাংশ পৃথিবীতে সূর্যের শক্তির পরিমাণ ও বণ্টন নিয়ে এ ধরনের কৃত্রিম পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ডেভিড হো বলেন, বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ছে।

তিনি বলেন, উষ্ণায়ন কমানোর লক্ষে কেউ কেউ মহাকাশে আয়না বসিয়ে সূর্যের আলো পৃথিবী থেকে দূরে প্রতিফলিত করার প্রস্তাব দিচ্ছেন। অথচ রিফ্লেক্ট অরবিটাল সেই আয়না ব্যবহার করে সূর্যের আলো পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ জলবায়ুর ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

সমালোচনার মুখে রিফ্লেক্ট অরবিটাল জানিয়েছে, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলগুলোকে কৃত্রিম আলোর আওতার বাইরে রাখার বিষয়ে বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে তারা।

প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র বলেন, তারা নজরদারি ও সমালোচনাকে স্বাগত জানান। সরকার, বিজ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করাকেই নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করেন তারা।

তবে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও রাতের আকাশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক এখনো কাটেনি।

সূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন