বিটিআরসির গণশুনানি: ইন্টারনেট ও কলরেট কমানোর বিষয়ে কাজ চলছে

বিটিআরসির গণশুনানি: ইন্টারনেট ও কলরেট কমানোর বিষয়ে কাজ চলছে

টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবার মানোন্নয়ন, গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষা এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এর আয়োজনে “টেলিযোগাযোগ সেবা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম” শীর্ষক গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিটিআরসি ভবনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার জনাব মাহমুদ হোসেন। গণশুনানি কার্যক্রমের সঞ্চালনা করেন কমিশনের সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন।

বিটিআরসির গণশুনানিতে গ্রাহক, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনলাইন পদ্ধতিতে আয়োজিত এ গণশুনানিতে টেলিযোগাযোগ সেবার মান, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতি ও মূল্য, মোবাইল ডাটা ও ভয়েস সেবার চার্জ, গ্রাহকসেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন, অভিযোগ ও মতামত উপস্থাপন করা হয়।

গণশুনানি উপলক্ষে গত ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে মোট ২ হাজার ৯৯০ জন গ্রাহক নিবন্ধন করেন যার মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন পেশাজীবী ১,০৪৭ জন, ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী এবং নারী অংশগ্রহণকারী ১৭২ জন। অভিযোগ, মতামত ও প্রশ্নের মধ্যে কমিশনের সিস্টেম এন্ড সার্ভিসেস বিভাগ সম্পর্কিত ১০৪৫টি, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশন্স সম্পর্কিত বিভাগ ৮৪৪টি, স্পেকট্রাম বিভাগ সংশ্লিষ্ট ৬৩টি, লিগ্যাল এন্ড লাইসেন্সিং বিভাগ সম্পর্কিত ১৯টি এবং এনফোর্সমেন্ট এন্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট সংশ্লিষ্ট ৫টি। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ট্যারিফ, ডাটা স্পিড ও মেয়াদ, ডাটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর, লাইসেন্স ও সেবার মান সংক্রান্ত বিষয়ে।

গণশুনানি সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন কমিশনের সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের গণশুনানিতে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে সেবার মান, উচ্চমূল্য, দুর্বল নেটওয়ার্ক কাভারেজ, স্বচ্ছতা এবং সিম ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১,৭৫৬টি প্রশ্ন, মতামত ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

গণশুনানিতে অংশ নিয়ে জামালপুর থেকে রাকীব রায়হান মোবাইল অপারেটরদের কলরেট কমানো এবং গ্রামাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। জবাবে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ভয়েস কলের ট্যারিফ সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ২ টাকা। গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস কমানোর বিষয়ে বিটিআরসিতে কাজ চলমান রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আলম পারভেজ বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটক বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক রোলআউটের বাধ্যবাধকতা (Rollout Obligation) পূরণ করছে। পাশাপাশি হাওর-বাঁওড়সহ দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

ফুয়াদ হাসান খান নামে একজন গ্রাহক ডাটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড এবং মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। রেডিয়েশন বিষয়ে বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিটিআরসি নিয়মিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল টাওয়ারের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ (EMF Radiation) পরিমাপ করে থাকে। পরিমাপের ফলাফলে দেখা গেছে, নির্ধারিত আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ডের তুলনায় রেডিয়েশনের মাত্রা অনেক নিচে রয়েছে। ফলে বিদ্যমান মাত্রার রেডিয়েশন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

আনোয়ার সাদাত নামে একজন গ্রাহক অভিযোগ করেন যে, মোবাইল অপারেটররা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা আলাদা ব্যান্ডউইথ বিক্রি করছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল থাকে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন। জবাবে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রাহকদের বিভিন্ন চাহিদার কথা বিবেচনা করে মোবাইল অপারেটররা বিভিন্ন ডাটা প্যাকেজের সঙ্গে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সুবিধা যুক্ত করে থাকে।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় নেটওয়ার্ক সচল না থাকার বিষয়ে বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সারাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে একটি সক্ষমতা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের কোন এলাকায়, কখন এবং কোন মোবাইল টাওয়ার সচল বা অচল রয়েছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।

বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, যেসব অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলো সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় জানানো হয়, জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিটিআরসিতে মোট ১৩,০০৯টি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হেল্পলাইনের মাধ্যমে ৫,০৫১টি এবং ওয়েববক্সের মাধ্যমে ৭,৯৫৮টি অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময়ে মোট ১১,২৭৯টি অভিযোগ, অর্থাৎ ৮৬.৭০ শতাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

গণশুনানি অনুষ্ঠানে কমিশনের প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মো. মেহেদী-উল-সহিদ, স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ আমিনুল হক, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের মহাপরিচালক আশীষ কুমার কুন্ডুসহ বিটিআরসির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন