আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি লবি অত্যন্ত প্রভাবশালী। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নির্ধারণে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রায়ই এদের প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়তে হয়। ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সমঝোতা বা শান্তিচুক্তির পথে হাঁটছেন, তখন ইসরাইল ও তাদের লবি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এ ধরনের শান্তিচুক্তিকে তেল আবিব তাদের নিরাপত্তার জন্য ‘বিশাল বিপদ’ হিসেবে বিবেচনা করে।
রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থি নেতারা ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা এ চুক্তিকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—যদি শেষ পর্যন্ত এমন সমঝোতাই করতে হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন যুদ্ধ শুরু করেছিল। ইরান সরকার যখন সম্ভাব্য সমঝোতাকে ঘিরে উচ্ছ্বসিত, তখন ট্রাম্পের নিজ দলের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আমেরিকার সম্ভাব্য বড় ধরনের ছাড়ের খবরে।
সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হবে একটি বিপর্যয়। তার মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ যা অর্জন করেছিল, সবই এতে নষ্ট হয়ে যাবে।
এর আগে শনিবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে দলের ভেতরের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর রোববার সকালে তিনি কিছুটা সুর বদলান। তিনি বলেন, আলোচনা ‘সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে’ এগোচ্ছে এবং তার প্রতিনিধিদের তিনি তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ দিয়েছেন। পরে অবশ্য ট্রাম্প দাবি করেন, একটি ‘ভালো ও যথাযথ’ চুক্তি তৈরি হচ্ছে।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, খসড়া চুক্তিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে পেতে রাখা মাইন সরাবে এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে। একই সময় ইরান অবাধে তেল বিক্রি করতে পারবে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা চলবে।
এই সম্ভাব্য ছাড়গুলো রিপাবলিকান পররাষ্ট্রনীতি-সংশ্লিষ্ট কট্টরপন্থিদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সতর্ক করে বলেন, যদি হরমুজ প্রণালিকে রক্ষা করা সম্ভব নয় ধরে নিয়ে এই সমঝোতা করা হয়, তবে ইরানকে অঞ্চলটির প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হবে। তার মতে, এতে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি ইসরাইলের জন্য ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে দাঁড়াবে। গ্রাহাম আরো বলেন, ‘যদি এসব ধারণা সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে কেনইবা যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল।’
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান টম কটনও গ্রাহামের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। আর টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রজ বলেন, উদীয়মান চুক্তির খবরে তিনি ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। তার মতে, যদি ইসলামপন্থি ইরানি সরকার বিলিয়ন ডলার পায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে পারে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তাহলে সেটি হবে ‘একটি ভয়াবহ ভুল’।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সম্ভাব্য সমঝোতাকে ‘মোটেও আমেরিকা ফার্স্ট নয়’ বলে সমালোচনা করেন।
সম্ভাব্য সমঝোতার দোরগোড়ায় ইরান : রুবিও
সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তির বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকদের মধ্যে খুবই ভালো আলোচনার পর প্রস্তাব অনেকটাই টেবিলে রয়েছে এবং দুদেশের মধ্যে সোমবারই একটি সমঝোতা হতে পারে।
এর আগে রোববার ভারত সফরকালে রুবিও বলেছিলেন, ‘আলোচনা এখনো চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম গত রাতেই হয়তো কোনো ঘোষণা আসতে পারে। হয়তো আজই আসবে।’
পরবর্তীতে ট্রাম্প ‘চুক্তি করতে তাড়াহুড়ো না করার’ নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তার আগেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সমঝোতা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
এদিকে সম্ভাব্য সমঝোতার আশায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। রুবিও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে যে প্রস্তাব রয়েছে, সেটি আমার কাছে যথেষ্ট ভালো অবস্থান বলে মনে হচ্ছে।’ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ইরান অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এখনই খুব বেশি কিছু ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া পেতে কিছুটা সময় লাগে।’
অগ্রগতি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি আসন্ন নয় : ইরান
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে; তবে কোনো চুক্তি ‘আসন্ন’ নয় বলে গতকাল মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি। তিনি বলেন, এটি ঠিক যে, আলোচনায় থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্তমূলক অবস্থানে পৌঁছেছি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এখনই চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যাবে—এমন দাবি কেউ করতে পারে না।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বর্তমানে একটি গোপন স্থানে অবস্থান করছেন, যে কারণে তার দূতদের সঙ্গে যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার গতি ধীর করে দিচ্ছে।
সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে মতানৈক্য
আমেরিকার গণমাধ্যমে প্রকাশিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামবিষয়ক দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠাতে বা ১০ বছরের জন্য সমৃদ্ধকরণে সীমা আরোপে সম্মত হয়নি। তার ভাষায়, এসব বিষয় পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনাসূচিতে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে ইরান পশ্চিমাদের বোঝাতে চায়, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। যদিও এ ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়া জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। তবে সামরিক চাপের মুখে কোনো সমাধান নেই; বরং আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
এছাড়া হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও এখনো পূর্ণ সমঝোতা হয়নি। এ বিষয়ে ইরান এবং ওমান পারস্য উপসাগরীয় নৌপথ কর্তৃপক্ষ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। তবে ওমান সম্ভবত জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের পক্ষে যাবে না। ফলে ইরান যে নতুন কৌশলগত চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করেছে, তা সময়ের সঙ্গে কম কার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

