২৫ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে মানিকগঞ্জের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ। এখানে দূরদূরান্ত থেকে পড়াশোনা করতে আসা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের স্বল্প খরচে থাকা খাওয়া নিশ্চিতের জন্য তৈরি হয় দুটি ছাত্রাবাস। তবে দুটি ছাত্রাবাসের মধ্যে এখন আর একটিও সচল নেই। রাজনৈতিক অপ তৎপরতা, বহিরাগতদের মাদক সেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য ৮ বছর আগে 'আলীমুল হক' ছাত্রাবাসটি বন্ধ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। অপর ছাত্রাবাসটি ১৫ বছর আগে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেলে সেটি অপসারণ করা হয়। সেখানে নতুন কোনো স্থায়ী ছাত্রাবাস তৈরি হয়নি এ পর্যন্ত। ফলে দূরদূরান্ত থেকে পড়ালেখা করতে আসা ছাত্রদের বাড়তি অর্থ খরচ করে অন্যত্র মেস অথবা বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪২ সালে ২৩ দশমিক ৭৯ একর জমির ওপর কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা। তখন এই কলেজটির নাম ছিল 'দেবেন্দ্র কলেজ'। এটি ১৯৪৯ সালে ডিগ্রি কলেজ হিসেবে উন্নীত হয়। ১৯৬৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান, ১৯৬৪ সালে ডিগ্রি বাণিজ্য কোর্স চালু হয় এবং ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ডিগ্রি বিজ্ঞান কোর্স চালুর ফলে পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয়। ১৯৭২ সালে বাংলা সম্মান কোর্স শুরু হয় কলেজটিতে এবং ১৯৭৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক কৃষি কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮০ সালের ১ মার্চ সরকারি করা হলে কলেজের নাম হয় 'সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ, মানিকগঞ্জ'। কলেজটিতে একাদশ, দ্বাদশ, ডিগ্রি পাস কোর্সসহ বর্তমানে ১৭টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৪টি স্নাতকোত্তর বিষয় রয়েছে।
কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫ হাজার ৯১১। এর মধ্যে ১২ হাজার ৪৫৪ জন ছাত্র এবং ১৩ হাজার ৪৫৭ জন ছাত্রী পড়ালেখা করছেন।
ছাত্রদের আবাসিক সমস্যা দূর করতে কলেজ প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর ১৯৪৭ সালে কলেজ ভবনসংলগ্ন পেছনের অংশের উত্তর পাশে টিনের দুটি ঘরে ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরে এর নামকরণ করা হয় 'মঞ্জুরুল আলম ছাত্রাবাস'।
২০০৯ সালের ২ মার্চ ছাত্রাবাসটি আগুনে পুড়ে যায়। এরপর থাকার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ছাত্রাবাসটি অপসারণ করা হয়। এর ১৭ বছর পার হলেও নতুন কোনো স্থায়ী ছাত্রাবাসের উদ্যোগ নেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ায় আবাসিক সুবিধা নিশ্চিতে ১৯৯১ সালে কলেজের পশ্চিম পাশে আরো একটি দোতলা ‘আলীমুল হক’ ছাত্রাবাস করা হয়। ১৪টি কক্ষে ৫৬ জন ছাত্রের আবাসিক ব্যবস্থা ছিল ওই ছাত্রাবাসে। তবে পরবর্তী সময়ে গাদাগাদি করে শতাধিক ছাত্র থাকতেন।
রাজনৈতিক অপতৎপরতা, ছাত্রাবাসে বহিরাগত ছেলেদের উৎপাত, মাদকের আসর এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে ছাত্রাবাসে থাকা ছাত্ররা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ছাত্রাবাসটি বন্ধ করতে বাধ্য হয় কলেজ কর্তৃপক্ষ।
কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাফর ইকবাল বলেন, জেলার তিনটি উপজেলার নদীভাঙন–কবলিত দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার অনেক ছাত্র এই কলেজে পড়েন। কলেজে আবাসিক ব্যবস্থা থাকলে দরিদ্র পরিবারের এসব শিক্ষার্থীরা অল্প খরচে পড়ালেখার সুযোগ পেতেন। এ ছাড়া ছাত্রাবাসে নিরাপত্তার পাশাপাশি সময় এবং যাতায়াতের কষ্টও লাঘব হতো।
সদর উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। অথচ কলেজের ছাত্রদের আবাসনব্যবস্থা নেই। এতে চরম ভোগান্তি ও কষ্টের মধ্যে রয়েছেন ছাত্ররা। আবাসনসংকট দূর করতে আলীমুল হক ছাত্রাবাসটি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি মঞ্জুরুল আলম ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবি জানাই।’
সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস অ্যাডভোকেট জিন্নাহ খান বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের সময় অপরাজনৈতিকতায় কলেজের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। ছাত্রাবাসে বহিরাগতদের মাদক সেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্রাবাস বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এতে করে দূরদূরান্ত থেকে পড়ালেখা করতে আসা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে মেস কিংবা ফ্ল্যাটে থাকতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহফিল খান বলেন, আমাদের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে আবাসন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আলিমুল হক হলে মাত্র ৫৬ জনের ক্যাপাসিটি আছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সেটি বন্ধ রয়েছে।
অনেক দিন বন্ধ থাকার কারণে সেখানকার আসবাব, বিদ্যুতের তারসহ প্রায় সবই অকেজো হয়ে গেছে। আমার আহবানে সাড়া দিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং একটা বাজেটও হয়েছে সংস্কার কাজ করার জন্য। আমরা আশা করছি ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যেই হলের সংস্কার কাজ আরম্ভ করতে পারব।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-abb5a0.jpg)