৯/১১ হামলার ২৫ বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সন্ত্রাসী হুমকি রয়ে গেছে এবং দেশটি সন্ত্রাস দমনে প্রয়োজনীয় সতর্কতা হারাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। তার অভিযোগ, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সন্ত্রাসী হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক আন্দ্রেয়া মিচেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে হিলারি ক্লিনটন বলেন, সন্ত্রাস দমনে আমরা আমাদের সতর্কতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছি। কাউকে ভয় দেখানো বা পরিস্থিতি বাড়িয়ে দেখানোর জন্য নয়, বরং পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা সন্ত্রাসী তৎপরতার দিকে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না।
৯/১১ হামলার সময় নিউইয়র্কের সিনেটর ছিলেন হিলারি। গত ২৫ বছরে সন্ত্রাসী হামলার অনেক পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হয়েছে এবং কিছু পরিকল্পনা সফলও হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, সন্ত্রাসের হুমকি শেষ হয়ে যায়নি; বরং কিছুটা পিছিয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখনো হাজার হাজার উগ্রপন্থী রয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতি করতে চায়।
হিলারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন কাটিয়ে উঠতে হবে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয়—দুই ধরনের হুমকির মোকাবিলা করতে হবে। রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিপক্ষের পাশাপাশি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর মতো অরাষ্ট্রীয় শক্তিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে ।
ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করতে গিয়ে হিলারি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনায় যতটা মনোযোগ দিচ্ছেন, আফগানিস্তান থেকে আসা গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে ততটা মনোযোগী নন। এ ধরনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
হিলারির অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন অংশের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে পররাষ্ট্র দপ্তরের এমন কিছু ব্যবস্থাও রয়েছে, যেগুলো ঐতিহ্যগতভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সন্ত্রাসী হুমকি মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর ফলে পশ্চিম আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চোখ ও কান’ আগের মতো নেই।
গত বছর ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি উদ্যোগের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে হাজার হাজার পদ কমানো হয়েছিল। এর মধ্যে সিআইএ ও পররাষ্ট্র দপ্তরও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিলারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবস্থায় এখনো এফবিআই ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে অনেক নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা কাজ করছেন। তবে তাদের প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং সঠিক দায়িত্বকেন্দ্রিক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন। ফলে তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা হারাচ্ছেন।
হিলারির বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস এনবিসি নিউজকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক মুখপাত্র পাল্টা দাবি করেন, বিভাগটি পরিবর্তনশীল সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম এবং নিয়োগ, সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ রেকর্ড গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে ৯/১১ হামলার পর নিউইয়র্কের বায়ুদূষণ নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন হিলারি। গ্রাউন্ড জিরোতে গিয়ে তিনি কালো পর্দার মতো ধোঁয়া, বাতাসে ভাসমান কণিকা ও তীব্র গন্ধ দেখেছিলেন বলে জানান। তাঁর নিজের গলাতেও ব্যথা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
৯/১১-এর পর ম্যানহাটনের বাতাসের মান নিয়ে তৎকালীন বুশ প্রশাসনের দেওয়া তথ্য বিভ্রান্তিকর ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হিলারি বলেন, এর পেছনে ভুল বিজ্ঞান, জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা এবং সত্যের মুখোমুখি হতে অনীহা—তিনটিই কাজ করেছিল।
তিনি বলেন, কিছু নেতা হয়তো সত্যকে স্বীকার করতে চাননি, কারণ তারা অর্থনীতি সচল রাখতে, ওয়াল স্ট্রিট খুলে দিতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। ফলে তারা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু বিষয় উপেক্ষা করেছিলেন, অথবা প্রয়োজনীয় প্রশ্নই করেননি বলে মন্তব্য করেন হিলারি।
৯/১১-সংশ্লিষ্ট অসুস্থতার কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মানুষ মারা গেছেন—কমেডিয়ান ও ৯/১১ স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী জন স্টুয়ার্টের এমন বক্তব্য নিয়েও কথা বলেন হিলারি। তিনি বলেন, হামলার কারণে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত হলেও যারা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য নির্ধারিত কর্মসূচিতে নিবন্ধিত নন, তাঁদের কাছে পৌঁছানো, পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য শহর, অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে একসঙ্গে কাজ করে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


