যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির একটি হোটেলে নৈশভোজের সময় বিকট গুলির শব্দের পর দ্রুত সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলেনিয়া ট্রাম্পকে। শনিবার রাতে যে হোটেলে এ ঘটনা ঘটেছে, সেটির নাম ওয়াশিংটন হিলটন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস জানিয়েছে, সাত থেকে আটটি গুলির শব্দ শোনার পর প্রেসিডেন্ট, ফার্স্ট লেডি এবং অন্য অতিথিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রচণ্ড গুলির শব্দের সময় সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তারা চিৎকার করে সবাইকে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে বলছিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের কেউ মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন, কেউ আবার আশ্রয় নেন টেবিলের নিচে। পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ পাওয়ার পর সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশাপাশি এফবিআই কাশ প্যাটেলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে আটক করা হয় ওই ঘটনায় জড়িত শ্যুটারকে। আটকের পর শ্যুটারকে সোমবার আদালতে তোলা হবে বলেও জানিয়েছে অ্যাটর্নি অফিস। সেখানে তার বিরুদ্ধে দুটি চার্জ আনা হয়েছে। এই গুলির ঘটনার পর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, সাধারণত ‘প্রভাবশালী ব্যক্তি' যারা তাদের ওপরই বারবার এ ধরনের গুপ্ত হামলা করে থাকে। ওয়াশিংটন ডিসির মেয়র জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ এজেন্টকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিকেও হাসপাতালে নিয়ে তার অবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে, এই হামলার পেছনে কারা জড়িত বা এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য এখনো জানানো হয়নি।
‘আমরা সবাই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিলাম’
হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড সদস্য কোর্টনি সুব্রামানিয়ান নিজেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, প্রচণ্ড গুলির শব্দ শুনে সেখানে সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং ট্রাম্পসহ সেখানে উপস্থিত অনেকেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানেই শুয়ে ছিলাম। তখন নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নিয়ে যান। এরপর অন্যদেরও সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।’
সুব্রামানিয়ান বলেন, ‘ট্রাম্পের নিরাপত্তাকর্মীরা জানিয়েছে যে, সন্দেহভাজন বন্দুকধারীকে হোটেলের বলরুমের বাইরেই ধরে ফেলার কারণে তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করতে বলা হয়েছে’।
ওয়াশিংটন মেট্রোপলিটন পুলিশের অন্তর্বর্তী প্রধান জেফরি ডাব্লিউ ক্যারোল বলেছেন, সন্দেহভাজনের কাছে একাধিক অস্ত্র ছিল। তিনি জানান, সন্দেহভাজনের কাছে একটি শর্টগান, একটি হ্যান্ডগান এবং একাধিক ছুরি ছিল।
তিনি আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তিনি ‘ভালো অবস্থায়’ আছেন।

আটক করা হয়েছে গুলিবর্ষণকারীকে
ওই ঘটনার পর হিলটন হোটেলের বলরুম লকডাউন করা হয়। সেখানে হোয়াইট হাউস পুলের সদস্যদের ওই রুমের মধ্যে নিরাপদে রাখা হয়। পুল সদস্যেদর নিরাপদে যখন সরিয়ে নেওয়া হয়, তখনই সেখানকার দায়িত্বরত সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বলতে শোনা যায় গুলিবর্ষণকারীকে আটকের কথা। পরে অবশ্যই এফবিআইও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এফবিআই বলেছে, গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে আটকের পর তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
এফবিআইয়ের পূর্ণ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াশিংটন হিলটনে গুলির ঘটনার পর এফবিআই ওয়াশিংটন ফিল্ড অফিসের ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রেসপন্স স্কোয়াড দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সন্দেহভাজন ব্যক্তি আটকের পর হেফাজতে রয়েছে।’
পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, যে বন্দুকধারী গুলি চালিয়েছে, তাকে আটক করা হয়েছে। ট্রাম্প জানান, তিনি সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেন, ঘটনাস্থলে যে সিকিউরিটি ক্যামেরা ছিল, সেখানকার ছবিও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন, যেখানে ঘটনার শুরুর অংশটুকুই প্রকাশিত হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘এক ব্যক্তি একাধিক অস্ত্র নিয়ে নিরাপত্তা চেক পয়েন্টে হামলা চালায়। তবে তাকে সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা খুব দ্রুতই প্রতিহত করে এবং ধরে ফেলে।’ আটক গুলিবর্ষণকারীকে সোমবার আদালতে তোলা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার এবং বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে ফেডারেল কর্মকর্তাদের ওপর হামলা— এ দুটি বিষয়ে চার্জ আনা হবে আটক ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

‘প্রভাবশালী লোকদেরই টার্গেট করা হয়’, বললেন ট্রাম্প
ওই ঘটনার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প জানান, এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের একজনের খুব কাছ থেকে গুলি লেগেছিল। তবে তিনি তার শরীরে পরিহিত ভেস্টের কারণে রক্ষা পেয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি গুলিবিদ্ধ ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে কথা বলেছি। তিনি ভালো আছেন। তার মনোবলও অত্যন্ত দৃঢ়। তাকে বলেছি, আমরা তার পাশে আছি। তার জন্য আমরা গর্বিত।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল, যেখানে এ ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। তিনি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ও এফবিআই পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন।
বারবার কেন তাকেই টার্গেট করা হচ্ছে— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার ওপর দুটি হত্যাচেষ্টা হয়েছে, যদিও আজকের ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ এখনো কিছু জানায়নি।’
ট্রাম্প জানান, তিনি গুপ্তহত্যার ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এবং তার ধারণা হলো যারা সবচেয়ে প্রভাবশালী তারাই হত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের উদাহরণ টেনে বলেন, বড় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই সাধারণত এমন হামলার শিকার হন।
তিনি আরও বলেন, 'প্রভাবশালী লোকদেরই টার্গেট করা হয়।’ ডোনাল্ড ট্রাম্প যোগ করেন, ‘এটা বলতে আমার ভালো লাগছে না, কিন্তু আমি একভাবে এটা সম্মানের মতোই মনে করি।’ তিনি বলেন, তার প্রশাসন দেশের জন্য অনেক কাজ করেছে, তাতে কিছু মানুষ সন্তুষ্ট নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

