জয়ের পর আল-সাইয়েদের ব্যাপারে সুর কী একই আছে ট্রাম্পের

জয়ের পর আল-সাইয়েদের ব্যাপারে সুর কী একই আছে ট্রাম্পের
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মিশিগান থেকে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক বিরোধ নতুন এক মোড় নিয়েছে। নির্বাচনের আগে আল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দিয়ে সিনেটে যাওয়া ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার মুসলিম পরিচয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রশ্নে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন আল-সাইয়েদ। যদিও তার দাবি, শুধু সামরিক সহায়তা বন্ধ করলেই হবে না, ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রিও বন্ধ করতে হবে।

গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগানের সিনেট আসনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন ৪২ বছর বয়সী আবদুল আল-সাইয়েদ। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়েন তিনি। আগামী ৩ জানুয়ারি ২০২৭ তার সিনেটের দায়িত্ব গ্রহণের কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনের আগে আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক প্রচার চালিয়েছিলেন ট্রাম্প। গত ২৫ অক্টোবর মিশিগানের পোর্ট হুরনে এক নির্বাচনী সমাবেশে তাকে ‘জিহাদি’ ও ‘সন্ত্রাসীদের পক্ষের লোক’ বলে আখ্যা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এমনকি আল-সাইয়েদ সিনেটর হলে তাকে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ টেনে তার সিনেটে প্রবেশ ঠেকানোর আহ্বানও জানান ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের জবাব দিয়েছিলেন আল-সাইয়েদও। মিশিগানের গ্র্যান্ড র‌্যাপিডসে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ট্রাম্প তার পুরো নাম মনে রাখতে পেরেছেন, এটাই যথেষ্ট। নভেম্বরের পর তাকে ‘সিনেটর’ বলে ডাকলেই চলবে। তার এই বক্তব্যে সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের প্রচারণায় আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয় এবং ইসরাইলবিরোধী অবস্থানকে বিশেষভাবে সামনে আনা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তোলা হয়। তবে তার সঙ্গে সংগঠনটির কোনো সম্পর্ক থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করা। গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তার সমালোচনা করেন। তার বক্তব্য ছিল, মার্কিন করদাতাদের অর্থ দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত, বিদেশের সামরিক অভিযানে নয়।

নির্বাচনে জয়ের পর ৪ নভেম্বর এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-সাইয়েদ বলেন, ইসরাইলকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধে ট্রাম্পের ঘোষণাকে তিনি স্বাগত জানান। তার ভাষায়, ‘এই নীতিতে প্রেসিডেন্ট আসলে ঠিকই বলেছেন।’ তবে তিনি আরো বলেন, ইসরাইলের কাছে এমন অস্ত্র বিক্রিও বন্ধ করা উচিত, যেগুলো গণহত্যা ও বর্ণবৈষম্যের মতো গুরুতর অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আল-সাইয়েদ বলেন, ইসরাইলসহ কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীকে ভর্তুকি দিতে মার্কিন নাগরিকেরা কর দেন না। সেই অর্থ দেশের মানুষের প্রয়োজনেই ব্যয় করা উচিত। শুধু অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা বন্ধ নয়, ফিলিস্তিনি ও ইহুদি—উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য সমান অধিকার, শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষেও তিনি কথা বলেন।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কিংবা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যার অভিযোগ থেকে দেশটিকে রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রশ্নে ট্রাম্প ও আল-সাইয়েদের অবস্থানে এখন আংশিক মিল দেখা যাচ্ছে। তবে দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থান ও এর পেছনের যুক্তি এক নয়। আল-সাইয়েদ দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং ইসরাইলে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প নির্বাচনের পর বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তা বন্ধের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।

আল-সাইয়েদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিক ঘটনা। মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান এই সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা নির্বাচনী প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সহজলভ্য করা, করপোরেট অর্থের রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বিজয়ের পর তিনি বলেন, রিপাবলিকানরা তার নাম ও ধর্মীয় পরিচয়কে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু মিশিগানের মানুষ তাদের দৈনন্দিন সমস্যা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোট দিয়েছেন। তার মতে, এই জয় ট্রাম্পের রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পক্ষে একটি বার্তা।

নির্বাচনের আগে যিনি তাকে সিনেটে যেতে বাধা দেওয়ার কথা বলেছিলেন, সেই ট্রাম্পের ইসরাইলনীতি নিয়ে ঘোষণাকে এখন স্বাগত জানাচ্ছেন আল-সাইয়েদ। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, তার দাবি আরও বিস্তৃত—শুধু অর্থ সহায়তা নয়, অস্ত্র বিক্রি বন্ধ এবং ফিলিস্তিনি ও ইহুদি উভয় জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্র: এনপিআর, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্স

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...