উপহারের নির্ধারিত সীমা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগ

ট্রাম্পকে কাতারের উপহার দেওয়া বিমান ঘিরে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনার ঝড়

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ট্রাম্পকে কাতারের উপহার দেওয়া বিমান ঘিরে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনার ঝড়

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের বহনকারী ঐতিহাসিক বোয়িং ৭৪৭ বিমানটির বিদায়ের পরদিনই নতুন ও সাময়িক ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ উন্মোচন করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের একটি হ্যাঙ্গারে নতুন এই ভিআইপি বিমানের জমকালো উন্মোচন করা হয়। তবে কাতার সরকারের উপহার দেওয়া ৪০০ মিলিয়ন (৪০ কোটি) ডলার মূল্যের এই বিলাসবহুল বিমানটি নিয়ে ইতিমধ্যেই মার্কিন রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

উপহার ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক

'ভিসি-২৫বি ব্রিজ' নামের এই নতুন বিমানটি গাঢ় লাল, সাদা, গাঢ় নীল ও সোনালী রঙের সংমিশ্রণে সাজানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, মার্কিন কোনো কর্মকর্তা একই উৎস থেকে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ ৫০ ডলার মূল্যের বেশি কোনো উপহার বিনাশর্তে গ্রহণ করতে পারেন না। সেখানে কাতারের কাছ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিমান উপহার নেওয়া এই নিয়মকে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করেছে বলে দাবি করছেন বিরোধীরা।

তবে সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প একে একটি দারুণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এত বড় একটা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়াটা হবে চরম বোকামি। অন্যদিকে পেন্টাগনের তৎকালীন মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা সচিব সমস্ত ফেডারেল নিয়ম ও বিধান মেনেই কাতারের কাছ থেকে বোয়িং ৭৪৭ বিমানটি গ্রহণ করেছেন।

রূপান্তরে খরচ ১ বিলিয়ন ডলার, ব্যাহত হতে পারে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি

উপহার হিসেবে পাওয়া বিমানটিকে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে (কনভার্সন) খরচ হয়েছে আরও প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার। মূলত ২০২৭ এবং ২০২৮ সালে নির্ধারিত দুটি নতুন প্রেসিডেন্সিয়াল বোয়িং বিমান আসতে দেরি হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন ‘সেতু’ বা ‘ব্রিজ’ হিসেবে এই কাতারী বিমানটি ব্যবহার করা হবে। উল্লেখ্য, মূল দুটি বিমানের নির্মাণ খরচ ইতিমধ্যেই ৩.৭ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

সমালোচকদের দাবি, কাতার এর আগে এই বিমানটি বিক্রি করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। এখন এটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল স্ট্যান্ডার্ডে রূপান্তর করতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) আধুনিকীকরণ কর্মসূচি ‘সেন্টিনেল’ থেকে তহবিল ডাইভার্ট বা সরিয়ে নিতে পারে, যা ইতিমধ্যেই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে।

‘বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল বিমান’

উন্মোচন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প কাতারের আমিরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি একজন চমৎকার মানুষ। গত কয়েক মাসে তিনি অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে গেছেন। বিমানটির প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল বিমান বলা চলে। এটি যখন তৈরি করা হয়েছিল, এমন এক উচ্চমানে তৈরি করা হয়েছিল যা হয়তো আর কখনোই দেখা যাবে না।

বিদেশি নেতাদের আধুনিক বিমানের সাথে তাল মেলাতেই এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল দাবি করে ট্রাম্প বলেন, অন্যান্য দেশ আমাদের অনেক শ্রদ্ধা করে, অথচ তাদের বিমানগুলো আমাদের চেয়ে অনেক নতুন এবং উন্নত। আমাদের পুরোনো বিমান ব্যবহার করাটা কিছুটা হাস্যকর দেখায়।

পুরোনো বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি ও তড়িঘড়ি সংস্করণ

প্রেসিডেন্সিয়াল বহরে থাকা বর্তমান বিমান দুটি ১৯৯০ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আমলে যুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে সেবা দেওয়া এই বিমানগুলো এখন বেশ পুরোনো। চলতি বছরের শুরুর দিকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে যাওয়ার পথে একটি বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে মাঝ আকাশ থেকে ওয়াশিংটনে ফিরে আসতে বাধ্য হন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট তখন জানিয়েছিলেন, বিমানটিতে একটি ‘সামান্য বৈদ্যুতিক সমস্যা’ দেখা দিয়েছিল।

এই ঘটনার পরই বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে কাতারী বিমানটির আধুনিকায়নের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন বিমানটি যাতে দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া যায়, সেজন্য পরবর্তী প্রজন্মের মূল বিমানের কিছু পরিকল্পিত পরিবর্তন এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বিমান বাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেঙ্ক এক বিবৃতিতে আশ্বস্ত করেছেন, কমান্ডার ইন চিফের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রেসিডেন্সিয়াল মিশনের উচ্চমান বজায় রেখেই এটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিশেষ আকর্ষণ

ট্রাম্পের নিজস্ব ব্যক্তিগত জেটের রঙের সাথে মিল রেখে তৈরি করা এই নতুন বিমানটি আগামী ৪ঠা জুলাই আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনে ওয়াশিংটন ডিসির আকাশে ফ্লাইওভারে নেতৃত্ব দেবে। ট্রাম্প উপস্থিত জনতাকে বলেন, এই বিমানটি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভারের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে।

শুক্রবার সাংবাদিকদের বিমানটির ভেতরে ঘুরে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। এর ভেতরের আকর্ষণীয় ডেকোরেশনের মধ্যে লিংকন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুলে একটি হাঁসের সাঁতার কাটার বাঁধাই করা ছবি সাংবাদিকদের নজর কেড়েছে।

ভবিষ্যৎ ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের শঙ্কা

নতুন বিমানটি যুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই দীর্ঘদিনের পুরোনো টেইল নম্বর ২৯০০০ (বোয়িং ৭৪৭-২০০) বিমানটিকে অবসরে পাঠানো হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত একটি মিউজিয়ামে স্থান পাবে। তবে হালকা নীল ও সাদা রঙের আরেকটি সহযোগী বিমান (টেইল নম্বর ২৮০০০) নতুন ভিসি-২৫বি বিমানের সাথে নতুন মূল বিমান না আসা পর্যন্ত আকাশে উড়বে।

অনেকের আশঙ্কা ছিল, ২০২৮ সালে ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হলে তিনি এই কাতারী জেটটি নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ একটি ৭৪৭ বোয়িং বিমান উড়াতে প্রতি ঘণ্টায় খরচ হয় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ মার্কিন ডলার। যেখানে ট্রাম্পের নিজস্ব বোয়িং ৭৫৭ বিমান উড্ডয়নে প্রতি ঘণ্টায় খরচ মাত্র ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১৬ হাজার ডলার। ফলে বিপুল ব্যয়ের কারণে এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বহরে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন