ফররুখের কিসসাখানি বাজার

আশ্রাফ আলী নাফিছ

ফররুখের কিসসাখানি বাজার

পেশোয়ার! খায়বার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী এবং পাকিস্তানের বড় শহর। মধ্যযুগে ভারত ও মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যরুটে প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল এটি। পেশোয়ারকে উপমহাদেশের প্রবেশপথ বললে অত্যুক্তি হবে না। আলেকজান্ডার, সম্রাট বাবর, নাদির শাহ, আহমদ শাহ আবদালি এ পথে উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। শহরটিকে ‘সিটি অব ফ্লাওয়ারস’ও বলা হয়। এখানকার চাপলি কাবাব, পেশোয়ারি বিফ পোলাও এবং ঐতিহ্যবাহী বাদাম ও ড্রাই ফ্রুটস বেশ জনপ্রিয়। হস্তশিল্পের মধ্যে ‘পেশোয়ারি চপ্পল’ বেশ বিখ্যাত। এছাড়া নানা ফলমূল এবং বাহারি শরবতের দোকানের আছে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি। এখানকার তীব্র গরমে এ শরবত যেন ‘শরাবান তহুরা’!

পেশোয়ার শহরের ঐতিহাসিক চক ইয়াদগার, ঘণ্টাঘর এবং বালাহিসার দুর্গের কাছে অবস্থিত ‘কিসসাখানি বাজার’। বাজারটি পেশোয়ার শহরের কেন্দ্রে সবচেয়ে পরিচিত এবং জনাকীর্ণ বলা যায়।

বিজ্ঞাপন

ফররুখ আহমদ ছিলেন ঐতিহ্যবাদী রোমান্টিক ধারার কবি। ফিকশনধর্মী লেখায়ও তিনি অনন্য। পেশোয়ারে না এসেও কল্পনায় ভর করে ‘কিসসাখানি বাজার’ নামে সুখপাঠ্য দীর্ঘ কবিতা লেখেন। ফলত, তার ফিকশন জনরার কাব্য, ইতিহাসের গভীর পাঠ ও সূক্ষ্ম জীবনবোধ সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারণা পাই।

মধ্যযুগে কিসসাখানি বাজারটি—দিল্লি, অমৃতসর, লাহোর, কাবুল, দুশানবে, আশগাবাত এবং তাশখন্দের বণিক, মুসাফির এবং নামি যোদ্ধাদের বাণিজ্য কাফেলার জন্য সরাইখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তারা ঘোড়া এবং উটবোঝাই মালামাল নিয়ে কাবুলি গেটের সরাইখানায় এসে তাঁবু ফেলতেন। পরদিন কিসসাখানির বাজারে পণ্য খালাস করতেন অথবা দরকারি জিনিসপত্র ‘খরিদ’ করতেন। শীতের রাতে সরাইখানার চুলোয় আগুন জ্বলত। পেশাদার গল্পকাররা কাহওয়ায় চুমুক দিয়ে গল্পের পসরা বসাতেন। এদিকে বণিকযোদ্ধারা আগুনের চারপাশে গোল হয়ে সফর, যুদ্ধ এবং ইশকের দাস্তানে বুঁদ হয়ে থাকতেন। ফররুখ আহমদের ভাষায়—

কিসসাখানির বাজার! শুধু নামটাই নয়, এই বাজারের দীর্ঘ ইতিহাসও আমার কাছে রহস্যময় বলে মনে হয়েছে। এই ইতিহাস এক দিনের নয়, দীর্ঘদিনের। শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেছে, কিসসাখানির বাজারে দেশ-দেশান্তরের সওদাগর বিচিত্র পণ্য নিয়ে জমায়েত হয়েছেন। সারা দিন চলেছে তাদের বেচাকেনা, বিভিন্ন সওদার লেনদেন। দিনান্তে শুরু হয়েছে কিসসার আসর। মানুষের জীবন-মৃত্যুর মতোই সেসব কাহিনি আশ্চর্য, রহস্যময়। শতাব্দীর পর শতাব্দী কিসসাখানির বাজার বাঁচিয়ে রেখেছে তার এই ঐতিহ্য। কিসসাখানির বাজারের এটাই বৈশিষ্ট্য।

এ পৃথিবী পণ্যশালা... এই কিসসাখানির বাজার

এ-ও এক পণ্যশালা।... শেষহীন আলিফ লায়লার

অশেষ কাহিনি নিয়ে প’ড়ে আছে যুগ যুগান্তর,

মরু গিরি পাড়ি দিয়ে এসেছিল যত সওদাগর

চিত্রল, সোয়াত থেকে, তাতার বা খোরাসান থেকে

উটের সারির মতো উপত্যকা পথে এঁকেবেঁকে

হিমেল হাওয়ার স্পর্শে কঠিন শীতের সাঁঝে যে ধারা মন্থর

তাদের কাহিনি যত জমে আছে এ-মাটির মাঠের ওপর।

এখানে এনেছে সওদা-আঙুর, বেদানা, সেব, খোবানি, কিশমিশ,

হিরার ধারের মতো খঞ্জর, গালিচা আর ফুটন্ত নার্গিস!

কিন্তু যা বিস্ময়কর সে কেবল মানুষের বিচিত্র মিছিল

(পাহাড়ের পথ বেয়ে উঠে এলো যারা খুলে রহস্যের নীল)!

শীতের হিমেল ভোরে বহু দলে, বহু দেশ থেকে

পাখির ঝাকের মতো এলো ওরা, এলো একে একে

চিত্রল, সোয়াত থেকে; খোরাসান, বাদকশান থেকে

বরফ-জমানো পথে ক্ষণিকের পদচিহ্ন এঁকে

(যে নিশানা মুছে যাবে কঠিন তুষার ঝড়ে রাত্রির কিনারে)

তবু এলো, তবু এলোÑএই কিসসাখানির বাজারে।

(আংশিক)

বাজারটি কাবুলি গেট থেকে শুরু হয়। মধ্যযুগে পেশোয়ারে প্রবেশের জন্য যে ১৬টি দরজা বা গেট ছিল, তার মধ্যে কাবুলি গেট সবচেয়ে বিখ্যাত। এখানকার শতাব্দী-প্রাচীন স্থাপত্য, কারিগরি দোকান, খাবারের রেস্তোরাঁ এবং আদিম কাহওয়াখানা দেখে পর্যটকরা চোখ ফেরাতে পারেন না। কিসসাখানির বাজারের অনেকাংশজুড়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলী এবং হরেকরকম মুখরোচক খাবারের সুবাস—প্রতিনিয়ত পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। তারা চাপলি কাবাব, মাটন কড়াই, ভাজা মাছ, চিকেন রোস্ট, কাবলি পোলাও এবং কুলফি-ফালুদার মতো সুস্বাদু খাবারের সুবাস উপভোগ করে। পাশাপাশি বিখ্যাত কাহওয়া পান করতে করতে আজও প্রাচীন সংস্কৃতি, সংগীতাবহ এবং ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ-রেওয়াতের দিকগুলো নিয়ে আলোচনায় বসেন।

কিসসাখানির বাজারের সবচেয়ে সুপরিচিত পাত্র তৈরির প্রাথমিক উপাদান হলো মাটি। বিভিন্ন প্যাটার্ন এবং নকশায় তৈরি মাটির তৈজসপত্র পাকিস্তানে উপহার হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এছাড়া এখানে পিতলের তৈরি ল্যাম্প, ফুলদানি, প্লেট, রান্নার বিভিন্ন তৈজসপত্র এবং অন্যান্য আলংকারিক জিনিসপত্রের কদর আকাশচুম্বী! মধ্যযুগীয় প্রাচীন ‘কাহওয়া’ বা বর্তমান ‘গ্রিন টি’ আজও ঐতিহ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবেশিত হয়। কাহওয়া এখানকার নিয়মিত দর্শনার্থীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় পানীয়। এটি ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস পাতা থেকে তৈরি করা হয়। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ—বাড়িতে অতিথি এলে শুকনো ফলসহ গ্রিন টি পরিবেশন করা হবে। এছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠানেও প্রাথমিকভাবে গ্রিন টি দিয়ে আপ্যায়নের সূচনা হয়।

মোদ্দাকথা, কিসসাখানির বাজার ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিবেচনায় আগ্রহের কেন্দ্রে। এজন্যই হয়তো বা কিসসাখানির বাজারটিকে ‘স্টোরি টেলার্স বাজার’ও বলা হয়ে থাকে। কিসসাখানি বাজারে বলিউডের নামি অভিনেতা শাহরুখ খান, দীলিপ কুমারসহ অনেকের পূর্বপুরুষের পৈতৃক নিবাস হওয়ায় এদিকটায় পর্যটকদের ভিন্ন ধরনের আগ্রহ কাজ করে! তবে, কিসসাখানির বাজারে পেশাদার বণিকদের কিসসা, কাহওয়া, মুখরোচক খাবার এবং প্রাচীন স্থাপত্যের ভিড়ে লুকিয়ে আছে এক করুণ ইতিহাস।

১৯৩০ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে আব্দুল গাফফার খান ‘খুদাই খিদমতগার’ নামে অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। ২৩ এপ্রিল বিক্ষোভ জনসমাবেশে রূপ নিলে ইংরেজ বাহিনী সাঁজোয়া যান এবং ব্যাপক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ঘিরে ফেলে। এরপরের ইতিহাস খুবই করুণ! ইংরেজরা অনেককেই সাঁজোয়া যানে পিষ্ট করে হত্যা করে, অনেককে ওপেন ফায়ারে হত্যা করে। স্থানীয় বরাতে তৎকালীন গণহত্যায় প্রায় ৪০০ লোক আজাদির জন্য রক্তের নজরানা পেশ করেন! গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে বাজারের মাঝখানে নির্মিত সাদা মার্বেলের খিলানযুক্ত একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

কবি ফররুখ আহমদের ভাষায় শেষ করছি—

তারপর একদিন এ বাজার ভেঙে গেলে মৌসুমের শেষে

কাহিনি থামায়ে তার চলে যায় সওদাগর অচেনা বিদেশে!

আগামী মৌসুমে ফের হয়তো সে দেখা দেবে, হয়তো দেবে না

শেষ হ’লে জীবনের, বাজারের লেনদেন কিংবা বেচাকেনা।

হ’য়েছে এমন ঢের,... এ বাজার কাহিনি বলার

শুনেছে অনেক কষ্ট, দেখেছে সে অনেক শ্রোতার

বিস্মিত মুখের দীপ্তি; কিন্তু বহু মৌসুমের শেষে

সেইসব চেনামুখ হারালো কোথায় কোন অচেনা বিদেশে।

নতুন অচেনা মুখে ভরে ওঠে তবু এই প্রাচীন প্রান্তর,

আবার অচেনা কণ্ঠে জমে ওঠে দিন শেষে কিসসার আসর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...