চোখ যদি মানবদেহের বিশেষ ইন্দ্রিয় হয়ে থাকে এবং তা যদি বয়সের কারণে কখনো দুর্বল হয়ে পড়ে, আর সেই কারণে জগতের আলো দেখার অযোগ্য হয়ে যায়, তাতে দুঃখ পেয়ে কেঁদে ফেলা কারো কাছে খুব আশ্চর্যের ব্যাপার বলে মনে হবে না। আমার বাবা কাঁদছেন। আর বাবা যে এখন কাঁদছেন তাতে কেউ আশ্চর্যান্বিত হয়নি। তবে বাবার চোখের পানি আমার চোখের দৃষ্টিপথকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত করে দিয়েছে এবং গভীর করে তুলেছে চোখের মধ্য দিয়ে মনের ভেতরের নীরব হাহাকার। কোনোমতে চোখের পানি সংবরণ করে আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি অসাড় মৃতদেহের মতো। এতটাই ব্যথিত ও দুঃখিত হয়েছি যেন আমার চোখ ফেটে এখনই বেরিয়ে আসবে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু নয়, রক্ত। শিকারি কর্তৃক নিক্ষেপিত তীরে আহত হলে বনের হরিণ যেভাবে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে, আমিও এখন তেমনই যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে আছি।
অন্তর বিদীর্ণ আর চোখ বিশীর্ণ করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। বাবা জীর্ণ শরীর আর বিবর্ণ কাপড়ে মাটির ঠান্ডা মেঝের ওপর শুয়ে আছেন। আসলে শুয়ে নয়, মাটিতে পড়ে আছেন। বয়সের ভার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে থাকার শক্তি কেড়ে নিয়েছে।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া চোখের আলো হারানো বাবা আমার অবসর নেওয়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিংবা সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, অথবা কোনো গ্রুপ অব কোম্পানির ডিরেক্টর নন। তিনি একজন কৃষক, একজন সাধারণ মানুষ; শরীর-খাটা পুরুষ। পাহাড় কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করার মতো শক্তি ও সামর্থ্য ছিল একসময়। আর এখন সব শক্তি হারিয়ে মাটির মেঝেতে পড়ে আছেন। তার ক্লান্ত মুখখানি শুকনো ও ঘামে তৈলাক্ত। সুতি কাপড়ে তৈরি গায়ের জামাটি ঘামে ভিজে জবজবে। হাড্ডিসার অপরিচ্ছন্ন শরীরখানি অসহায়। বাবার অমন বিকৃত চেহারা দেখে আমার বুকের বাঁ পাশে এক ধরনের ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। একসময় টগবগে তাজা রক্তের চঞ্চলতা আর মাংসলপেশির দৃঢ়তায় কর্মে অক্লান্ত ছিলেন যে মানুষটি, তিনি আজ কেমন অসহায়!
বাবা একটু আগে খাট থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেছেন। উঠে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে চাইলেও পারছেন না। তাকে বারবার ছোট বাচ্চার মতো হামাগুড়ি দিতে দেখে ভয় পেয়ে মা চিৎকার করে আমাকে ডেকেছেন—‘হাসু, অ হাসু!’
আমি কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। ডাক শুনে ছুটে গিয়ে মায়ের কাছে দাঁড়াতেই মা রান্নাঘরের হলুদ-বাটায় রঙিন শীর্ণ হাতটি বাবার দিকে ইশারা দিয়ে চোখ দুটো বড় করে বলেন, ‘ওই দ্যাখ্!’
বাবাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে আমি একটু ভয় পেয়ে যাই। তাকে ধরে ওঠাতে যাব, অমনি মা পেছন থেকে বাধা দিয়ে বলে ওঠেন, ‘আহা, ধরিস নে। বাহাদুরি যখন দেখাতে চাচ্ছে, দেখাক না।’
মা যে বাবাকে কটাক্ষ করছেন, বাবা তা বুঝলেন কি না জানি না। প্রায়ই বাবা ও মায়ের মধ্যে এ রকম কপট কটাক্ষ কিংবা তাচ্ছিল্যের ঘটনা ঘটে। মা এখন শুধু তাচ্ছিল্য করে ছাড়েননি, রীতিমতো উপহাস করেছেন। বাবা মুখ ফুটে কিছু বলেননি। বাবা এমনই। খুব বেশি কথা বলেন না। খুব সহজে মন খারাপ করেন না। কারো প্রতি কোনো ক্ষোভ রাখেন না। জীবনের শেষ বেলাতে এসে বুঝি বাবা আরো নিথর ও নীরব হয়ে গেলেন।
বাবার একটা চশমা ছিল, সেটির ডাঁটি ভেঙেছে কয়েক দিন হয়ে গেছে। কিন্তু এ কথাটা বাবা আমাকে বলেননি। মা বললে পারতেন; কিন্তু মাও বলেননি। আমার স্ত্রী এখন এই সংসারের সবকিছু সামলাচ্ছে। বলেনি সেও। চশমা ছাড়া বাবা অচল। হাঁটাচলা করতে পারেন না। কারো সাহায্য ছাড়া বিছানা থেকেও নামতে পারেন না। অজু, গোসল এমনকি পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হলেও বাথরুমের দরজায় কেউ এগিয়ে না দিলে যেতে পারেন না। একা একা দুই হাত সামনে প্রসারিত করে কোনো কিছু ধরে ধরে আন্দাজে পা ফেলে হাঁটতে গিয়ে কতবার যে পড়ে ব্যথা পেয়ে কুঁকিয়ে উঠেছেন! তবু বাবা নতুন একটা চশমা কিনে দিতে বলেননি আমাকে। ফলে, এখন মেঝেতে!
আমি বিচূর্ণ বুক আর জলবিশীর্ণ চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে আছি। চোখের জল গোপন করে বাবাকে ডাকি, ‘বাবা? ও বাবা?’
‘হুম!’ অস্ফুটে আমার ডাকে সাড়া দেন বাবা।
ধীর গলায় জানতে চাই, ‘আপনার চশমা ভেঙে গেছে আমাকে আগে বলেননি কেন?’
‘চশমা কিনতে ট্যাকা লাগব না!’ বাবার সহজ স্বীকারোক্তি।
একটা নতুন চশমা কিনতে যে টাকা লাগে—আমার মনে না থাকলেও বাবা কথাটা ভোলেন না। অল্প টাকা বেতন পাওয়া তার স্কুল মাস্টার ছেলের হিসেব করা টাকা খরচ করতে চাননি বলেই হয়তো আমাকে বলেননি। অথচ চোখে দেখতে না পেয়ে তার চলাচলেই কষ্ট হচ্ছে! এতদিন কেন আমার চোখে পড়েনি? বাবাকে নয়, বাবার কষ্টটার কথা বলছি। তার কষ্টটা আমার চোখে কেন পড়েনি, সেটা ভেবে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা সন্তান মনে হলো নিজেকে।
‘একটা চশমা কিনতে কত টাকা লাগে? তোর বাবাকে একটা চশমা এনে দিতে পারিস না? দেখবি একদিন এভাবে পড়ে গিয়ে মরে আছেন।’ কিছুটা খেদ জড়ানো গলায় কথাগুলো বলেন মা।
চোখে কম দেখা বাবার জন্য একটা চশমা কেনার টাকা থাকে না যে সন্তানের, তার বেঁচে থাকার কী প্রয়োজন? বেঁচে থাকার সব অধিকার যেন হারিয়ে ফেলেছি—এমন একটা অপরাধবোধ আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। মনে পড়ে, ছোটবেলায় রাত্রিশেষে ঘুম ভাঙলে সূর্যোদয়ের আগেই ফসলের মাঠে কাজ করতে বের হয়ে যেতেন আমার কৃষক বাবা। কাজের চাপে পান্তাভাত আর কাঁচামরিচসমেত সকালের নাশতা দুপুরে আর দুপুরের খাবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে খেতেন। সঠিক সময়ে খাওয়ার অবকাশ পেতেন না। অবশ্য অবকাশ বলে কোনো শব্দ বাবার অভিধানে ছিল না। কর্মক্লান্ত হয়ে দিনান্তে বাড়ি ফিরে এলে মা যখন খেতে দিতেন, তখন আমাকে ডেকে পাশে বসিয়ে খাওয়াতে ভুলতেন না কোনোদিন।
মনে আছে, কাশীপুর গ্রামের বৈশাখী মেলা থেকে বাবা একবার একটা হেলিকপ্টার কিনে এনে দিয়েছিলেন। একটা কাঠির সঙ্গে দুটো চাকা আর একটা পাখা লাগানো সেই জিনিসটা ছিল দারুণ! ঠেলে এগিয়ে নিলে পাখাটা ঘুরত। কী খুশিই না হয়েছিলাম! আরেকবার এনে দিয়েছিলেন চোঙের মতো একটা বাঁশি। ফু দিলে বেজে উঠত কর্কশ একটা শব্দে। সবার কাছে যেটা কর্কশ সেটা আমার কাছে কী যে মধুর লাগত! দুপুরবেলায় পোঁ পোঁ শব্দে যখন দাদার ভাতঘুম ভেঙে যেত, লাঠি নিয়ে আসতেন তেড়ে। ঠ্যাঙানির ভয়ে আমি ভোঁ দৌড় দিতাম। বাবার দেওয়া এ রকম অসংখ্য জিনিস পেয়ে আনন্দে কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর, এমনকি যৌবনের পুরো সময়। অথচ আমি বাবার জন্য একটা চশমা কিনতে পারি না। একটা চশমার কতইবা দাম? যতই ছোট চাকরি করি—একটা চশমা কেনার টাকার তো অভাব হওয়ার কথা নয়। আসলে টাকার অভাব নয়, এটা আমার নির্লজ্জ স্বভাব বলা যায়। নির্লজ্জ বলতেই হলো। যে ছেলে তার বাবার এমন দুর্দশার মধ্যেও একটু খেয়াল-খবর রাখে না, এমন ছেলেকে তো নির্লজ্জ বলাই শ্রেয়।
‘তোমরা পেলে কী? কেবল নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত! নিজের বউ-বাচ্চার জন্য তো হাজার হাজার টাকা বিলিয়ে দিতে দ্বিধা কর না। দয়া করে আমার দিকে একটু তাকাও। আমার জন্য একটা চশমা কিনতে তোমাদের টাকা থাকে না!’
এখন এই ধরনের কথা আমাকে বলে রাগ দেখানো উচিত বাবার। কিন্তু বাবা তা করেন না। মাটির মতো সরল-সহজ বাবাকে কখনো রাগ করে সামান্য উঁচু গলায় কথা বলতে দেখিনি। বাবার এই নীরবতায় আমার ব্যর্থতা ও দীনতা প্রকাশিত হয়েছে।
বাবাকে টেনে তুলে বসিয়ে দেন মা। মায়ের শরীরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বাবা বলেন, ‘জানো হাসুর মা, যখন সবকিছুতে অন্ধকার থাকে, তখন আর চোখের অন্ধত্বে সমস্যা হয় না।’
মা কোনো কথা বলেন না। তার মনের অবস্থা অনুমান করতে পারি। তাই আমি মনে মনে নয়, একেবারে মুখে উচ্চারণ করে সিদ্ধান্ত নিলাম—‘আজ বাসায় ফেরার সময় বাবার জন্য একটি চশমা কিনে আনবই।’
এতদিন পর তবু আমার মনে ইচ্ছেটা তৈরি হলো বলে একটু পরিতৃপ্ত হই। তবে এতদিন পর, এতটা সময় পেরিয়ে ইচ্ছেটা হলো বলে নিজের প্রতি একটু বিরক্ত হয়ে পড়েছি। বাবার চশমার যে ডাঁটি ভেঙে গেছে, এ কথা আমাকে কেউ জানায়নি। কত টাকাই বা লাগে একটা চশমা কিনতে? খুব বেশি নয়। একটা চশমা কেনার সামর্থ্য আমার আছে; কিন্তু কেনা হয়নি। আসলে বাবার দিকে ওভাবে লক্ষ রাখা হয়নি। সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় দেখে যাই ফজরের নামাজ আদায় করে বাবা ঘুমিয়ে আছেন। রাতে ফিরে আসার আগেই আবার ঘুমিয়ে পড়েন। এর মাঝখানের সময়টাতে নিজের বউ-বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ততায় নিমগ্ন হয়ে আর বাবার খোঁজ নেওয়া হয় না। অবশ্য মা-বাবাকে আমার স্ত্রী দেখবে বলে ভেবেছি। দিনে দিনে বাবার শারীরিক অবস্থার যে এতটা অবনতি হয়েছে, চোখের দৃষ্টিতে যে অমন ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে, তা বাড়ির কেউ খেয়াল করেনি। সকালে বাবা বিছানা থেকে নামতে গিয়ে পড়ে না গেলে হয়তো আজও জানা হতো না। মাটির মেঝেতে ছোট্ট শিশুর মতো বাবাকে অসহায় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে আমার বুক বিদীর্ণ হয়েছে, আর চোখের দৃষ্টিপথ হয়েছে প্রসারিত। এতদিন বাবার প্রতি দৃষ্টিপাত না করে আমি যে কোন মোহে আবিষ্ট ছিলাম, তা ভেবে নিজেকে দুর্ভাগা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।
বিকেলে স্কুল শেষে বাসায় ফেরার সময় বাবার জন্য একটা চশমা নিয়ে বাসায় এলাম। চশমা পেয়ে বাবা খুশি হলেন কি না, সেটা বুঝতে না দিয়ে সেই চিরন্তন বাণী শোনাতে লাগলেন, ‘আমি তো সারা দিন বাসায়ই থাকি, বাইরে বের হই না। বড়জোর এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যাই। চোখের দেখা না দেখায় কিছু আসে-যায় না। এতগুলো টাকা খরচ করে একজন অন্ধ ও অচল মানুষের জন্য চশমাটা না আনলেই পারতে।’
জীবনসায়াহ্নে এসেও সন্তানের প্রতি দুশ্চিন্তা দূর হয় না। বাবারা বুঝি এমনই হন!
লেখক : বাসার তাসাউফ, সহকারী শিক্ষক (বাংলা), হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

