ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি

আমিন আশরাফ

ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি

ছোটবেলা থেকেই মাথায় একটা ভূত চেপেছিল। ইতিহাসের ভূত। নাওয়া-খাওয়া ভুলে হাজার পৃষ্ঠার মোটা মোটা বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকতাম। বই যত বড় হতো, মনে আনন্দ হতো তত বেশি। মনে হতো, বেশ কিছুদিনের খোরাক জুটে গেল। এই নিয়ে বাবা আর চাচার বকা কম শুনতে হয়নি।

দিন ফুরোলো। সময়টা সম্ভবত দু’হাজার পাঁচ কিংবা সাত। এক ঈদের বাজারে মুসলিম জাহানের ঈদসংখ্যায় হাতে এলো শফীউদ্দীন সরদারের ‘বারো ভূঁইয়ার উপাখ্যান’। ঈদের আমেজ শেষ হওয়ার আগেই গোগ্রাসে গিলে ফেললাম পুরো উপন্যাস। আর তা পড়তে গিয়েই চমকে উঠলাম। বুকের ভেতর একটা তীব্র আফসোস মোচড় দিয়ে উঠল। মসনদে আলা ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানীটি নাকি আমাদের বাড়ির একেবারে কাছেই! কালের জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে বয়ে চলা নরসুন্দা নদীর পাড় ঘেঁষেই তার অবস্থান। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো—এত কাছে ইতিহাসের এমন গৌরবময় ঐতিহ্যের সিংহদ্বার, অথচ আমি ছাড়া আর কার তা অজানা ছিল!

বিজ্ঞাপন

কুফা আর মফস্বল শহরের অটো কিংবা সিএনজিচালকদের মুখে ‘জঙ্গলবাড়ি-জঙ্গলবাড়ি’ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যেত রোজ। কিন্তু এই জঙ্গলবাড়ির আড়ালে যে এক হার-না-মানা মহাবীরের নাম লুকিয়ে আছে, তা তখনো জানা ছিল না।

রমজানের এক কুয়াশামাখা ভোর। চারপাশটা কেমন যেন আবছা, রহস্যময়। ঘর থেকে বের হলাম জঙ্গলবাড়ির উদ্দেশে। সঙ্গে জুটে গেল তারাবির নামাজের কজন ছোকরা মুসল্লি।

গাঁয়ের ছেলে হলেও বড় হয়েছি মফস্বল শহরে। অনেক দিন পর এমন মাটির গন্ধমাখা গ্রামের মেঠোপথে পা রাখা। কিশোরগঞ্জ থেকে যে গ্রামটায় তারাবি পড়াতে এসেছি, তার নাম হাত্রাপাড়া। সঙ্গের ছেলেগুলো জানাল—বেশি দূরে নয় হুজুর, হাঁটতে হাঁটতেই ঈশা খাঁর রাজ্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ভোরের তিরতিরে ঠান্ডা বাতাসে শরীর ও মন কেমন যেন চনমনে হয়ে উঠল। ইচ্ছে করছিল ছোটবেলার মতো আনন্দে একটু দৌড়াদৌড়ি করি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, এই পিচ্চিদের সামনে আবার ‘প্রেস্টিজ’ চলে যাবে না তো! নিজেকে সামলে নিলাম।

যতই এগোচ্ছি আমার সঙ্গে ছেলেগুলোর উৎসাহ ততই বাড়ছে। হঠাৎ একজন আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘এই যে দেখুন, হুজুর! এটা কিন্তু সাধারণ রাস্তা ছিল না, রাজপথ ছিল। এই পথ দিয়েই ঈশা খাঁ তার বিশাল বাহিনী নিয়ে আসা-যাওয়া করতেন।’

থমকে দাঁড়ালাম। চেয়ে দেখি, জৌলুস হারানো পথটা আজ আর রাজপথ নেই। ভেঙে যাওয়া ইট-সুরকিগুলো যেন বোবা সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে। এই বুক চিরেই তো ইতিহাসের মহানায়ক এককালে তার তেজি ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন! চোখের সামনে যেন একটা সিনেমার দৃশ্য ভেসে উঠল—বুকের ভেতর বেজে উঠল তলোয়ারের ঝনঝনানি, মসনদে আলা ঈশা খাঁর দুর্গজয়ের দৃশ্য।

সে এক ইতিহাস। ১৫৮৫ সাল। মসনদে আলা ঈশা খাঁ বর্তমান কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার এই জঙ্গলঘেরা দুর্গে আক্রমণ করেন। তখন এই দুর্গে রাজত্ব করতেন কোচ রাজা লক্ষ্মণ হাজরা ও রাম হাজরা। ঈশা খাঁ তাদের পরাজিত করে নিজের পতাকায় মুড়ে নেন জঙ্গলবাড়ি দুর্গ।

হাঁটতে হাঁটতে যখন জঙ্গলবাড়ির ঠিক সিংহদ্বারে পৌঁছালাম, মনে হলো সত্যি এক পরিপাটি জঙ্গলরাজ্যে এসে হাজির হয়েছি। প্রকৃতির সবুজ আয়োজন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অপূর্ব, ছায়াঢাকা এক জঙ্গলবাড়ি। ভাবতেই অবাক লাগে, একসময় এই নিঝুম গ্রামটাই ছিল এক জ্যান্ত বীরের রাজত্ব! যেখানে দিনরাত ঘোড়ার খুরের শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠত। বাতাসের বুকে উড়ে বেড়াত ধূলিঝড়। রাস্তার দুপাশের নাম না জানা গাছগুলো পাতা নাড়িয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, নেপথ্যে থেকে তারা ফিসফিসিয়ে বলছে, ‘এসো পিচ্চিরা, আমার কাছে এসো। আমিই তোমাদের শোনাব মসনদে আলা ঈশা খাঁর জানা-অজানা সেই সাচ্চা দাস্তান।’

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে চেনা ছবিটা স্পষ্ট হয়। মোগল সম্রাট আর ইংরেজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলার অসহায় জমিদাররা গোপনে ঈশা খাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ১৫২৯ সালের ১৮ আগস্ট জন্মেছিলেন এই বীর। বাবা সোলায়মান খাঁ ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক দলপতির বংশধর। সুলতান নুসরত শাহের রাজত্বকালে তারা বাংলায় আসেন। নিজের একনিষ্ঠ চেষ্টায় ঢাকা ও ময়মনসিংহের উত্তর-পূর্ব অংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন সোলায়মান খাঁ। কিন্তু নিয়তির খেলা ভিন্ন ছিল। দুবার বিদ্রোহ করার পর ১৫৪৮ সালে তিনি নিহত হন। ঈশা খাঁর বয়স তখন মাত্র ১৯। পিতৃব্য কুতুবউদ্দীনের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন তিনি।

বাংলার জমিদারদের সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ঈশা খাঁ আফগানিস্তান থেকে ১ হাজার ৪০০ অশ্বারোহী, ২১টি যুদ্ধনৌকা আর প্রচুর গোলাবারুদ নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে এসে নামেন। সেখান থেকে প্রথমে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি এবং পরে সোনারগাঁও দুর্গ দখল করেন। সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম। ঈশা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চাঁদ রায়ের কন্যা এবং কেদার রায়ের বোন স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করেন। স্বর্ণময়ী পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম রাখা হয় সোনাবিবি। আর সেই প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম অনুসারেই বাংলার রাজধানীর নামকরণ করা হয় ‘সোনারগাঁও’।

সম্রাট আকবরের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন ‘মসনদে আলা’ উপাধি। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, দিল্লির রাজসিংহাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী সুলতান দাউদ কররানীকে এক যুদ্ধে সাহায্য করায় তিনি এই উপাধি পেয়েছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে মোগলদের আগ্রাসন থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে বারো ভূঁইয়াদের নেতা, দূরদর্শী সুশাসক ঈশা খাঁ ১৫৯৭ সালে মোগল সেনাপতি মানসিংহকে পরাজিত করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখেন। সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে তিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বুনেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার প্রথম বীজ বোধহয় তিনিই বুনেছিলেন। তার সাহস আর দেশপ্রেমের গল্প আজও রক্তের ভেতর তরতাজা শিহরন জাগায়।

দুর্গের ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ল একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। গায়ে তার স্পষ্ট মোগল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ। ৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১৮ ফুট প্রস্থের মসজিদটির ছাদে তিনটি গম্বুজ যেন আকাশপানে চেয়ে আছে। প্রতিটি কোণে একটি করে চোখধাঁধানো মিনার। পুব দিকে ১১ ফুটের একটা খোলা বারান্দা। শুনলাম, স্থানীয় মুসল্লিরা এখনো এখানে নিয়মিত নামাজ পড়েন।

মসজিদের পাশেই পাকা করা কিছু কবর। ছোকরাগুলো এক হাত দেখিয়ে বলল, ‘হুজুর, এখানে কোনো একটা কবর বোধহয় ঈশা খাঁর হবে।’

মনে মনে হাসলাম। বড় হয়ে ইতিহাস পড়ে জেনেছি—এগুলো ঈশা খাঁর আত্মীয়দের কবর। ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ির এই মাটিতে ঘুমিয়ে নেই। জীবনের শেষ দিনগুলোয় তিনি বিভিন্ন দুর্গে ঘুরে বেড়াতেন। ১৫৯৯ সালে মহেশ্বরী পরগনার অন্তর্গত বক্তারপুর দুর্গে গিয়ে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে বছরই ১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় ৭০ বছর বয়সে এই সিংহপুরুষ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার বক্তারপুর গ্রামে আজও তিনি সমাহিত আছেন।

প্রায় ৪০ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই জঙ্গলবাড়ি দুর্গটি ঈশা খাঁ সামন্ত রাজার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার পর নতুন করে সংস্কার করেছিলেন। দুর্গের তিনদিকে পরিখা খনন করে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, যাতে পুরো জঙ্গলবাড়ি একটা সুরক্ষিত ব-দ্বীপের মতো দেখায়।

আজ সেই জৌলুস আর নেই। ইতিহাস এখানে এক নির্জীব, ক্লান্ত সাক্ষী মাত্র। একটু সামনে এগোতেই উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ইটের পাঁচিল দিয়ে ভাগ করা দুটি চত্বর চোখে পড়ল। স্থানীয়রা একে বলে ‘প্রাসাদ প্রাচীর’। দুর্গের দক্ষিণে একটা ভাঙা তোরণ, তার সামনে ‘করাচি’ নামের পূর্বমুখী একতলা ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। তোরণের পেছনে ‘অন্দরমহল’; আর বাড়ির সামনে রয়েছে সেই পুরোনো আমলের খনন করা একটি দীঘি, যার স্থির জল অতীতে ডুব দিতে বাধ্য করে। দুর্গের ভেতরের দরবারঘরটি সংস্কার করে এখন ‘ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার’ করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে ঈশা খাঁর কিছু ছবি, তার বংশধরদের তালিকা আর টুকরো কিছু নিদর্শন।

দুর্গের বাইরে তাকালে মাটির বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় অসংখ্য প্রাচীন ইটের টুকরো আর মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন, এগুলো নাকি মুসলমানরা আসারও আগের নিদর্শন। তবে দুর্গের ভেতরে ঈশা খাঁর বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ এখনো কালের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। ছাদ ধসে গেলেও দরবার কক্ষের অনেকটাই চেনা যায়। পান্থশালায় এখনো ১০-১২টি কক্ষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের ভেতরে ঘুরঘুর করার সময় ভেতরের লোকজন কেমন যেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘একটু দেখতে এসেছি।’

আমার পরনে হুজুরদের পোশাক দেখে তারা খাতির করে একটা চেয়ার এনে বসতে দিল। গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, এই বাড়িতে সর্বশেষ বসবাস করে গেছেন ঈশা খাঁর চতুর্দশ বংশধর দেওয়ান ফতেহ আলী দাদ খাঁ। ২০১৩ সালে তিনি মারা যান। বর্তমানে তার ছেলে দেওয়ান মামুন দাদ খাঁ পরিবার নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের রথখলা এলাকায় থাকেন। মাঝে মাঝে এসে তারা নিজেদের এই আদিপুরুষের দুর্গটি দেখে যান।

যাওয়ার বেলায় শুনলাম, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নাকি আশ্বাস দিয়েছে এই দুর্গটি সংস্কার করার। খুব জলদিই নাকি কাজ শুরু হবে।

ফিরে আসার সময় নরসুন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন জঙ্গলবাড়ির দিকে তাকালাম, গোধূলির আলোয় মনে হলো—ইতিহাস কখনো মরে না; সে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ফিসফিস করে কথা বলে। কেবল শোনার মতো কান থাকা চাই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন