ইরাকের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় খালিদ ইবনে ওয়ালিদের প্রতি খলিফা আবু বকরের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল—আপার ইরাক দিয়ে অভিযান শুরু করে প্রধান লক্ষ্য হীরার দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে। হীরা অধিকার সম্পন্ন হলে এই স্থানকে কেন্দ্র করে পরবর্তী অভিযানের পরিকল্পনা সাজাবে। জুতসই লোকেশন ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে খলিফা হীরাকে কেন্দ্র করে ইরাক অভিযানের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাই হীরাই ছিল মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রাথমিক টার্গেট। হীরা বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনী প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন করে নেয়।
খলিফা আবু বকর ইরাক অভিযানে দুজন সেনাপতিকে পাঠিয়েছিলেন। আপার ইরাক দিয়ে অভিযান শুরু করেছিলেন প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। আর ইয়াজ ইবনে গানাম ইরাকে প্রবেশ করেছিলেন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে। একদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ হীরা জয় করে ফেললেও ইয়াজ ইবনে গানাম পারসিকদের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারছিলেন না। দাউমাতুল জানদালে কোনো রকমে শত্রুর মোকাবিলায় টিকে ছিলেন। সেনাপতি খালিদ সিদ্ধান্ত নিলেন—ইয়াজের সাহায্যে তিনি এগিয়ে যাবেন।
আনবার (জাতুল উয়ুন)
আনবার ছিল দজলা নদীর পূর্বতীরে, বর্তমান সাকলাওয়িয়া অঞ্চলের অন্তর্গত এলাকায় অবস্থিত ইরাকের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একটি নগর। প্রাচীনকাল থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পারসিক যুগে আনবার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক ও সামরিক ঘাঁটি ছিল।
দুমাতুল জান্দালের উদ্দেশে রওনা হয়ে সেনাপতি খালেদ আনবারের প্রতিপক্ষের বাধার মুখোমুখি হলেন। তিনি চাইলে তাদের উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতে পারতেন; কিন্তু তাতে বাহিনীর পেছন দিকটা অনিরাপদ রয়ে যেত। এই ঝুঁকি তিনি নিতে চাইলেন না।
মুসলিম বাহিনীর অভিযানের জন্য আনবারবাসী আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তারা দুর্গের চারপাশে পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুরক্ষিত করল। এরপর দুর্গের ভেতরে ঢুকে বসে থাকল। মুসলিম বাহিনী আনবার দুর্গের চারপাশে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করলেন। মুসলিমরা সঙ্গে থাকা দুর্বল উটগুলো জবাই করে পরিখার সরু অংশ ভরাট করে ফেলল। এরপর দুর্গ নিজেদের দখলে নিয়ে নিলেন। সেনাপতি খালেদ এই দুর্গের দায়িত্বে জাবরকান ইবনে বদরকে নিযুক্ত করলেন।
আইনে তামর
আনবার বিজয়ের খালেদ ইবনে ওয়ালিদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র আইনে তামর। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে আরব ও পারস্যের সম্মিলিত শক্তি সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল। তাদের নেতা ছিল উক্কাহ ইবনে আবি উক্কাহ। অন্যদের মতো তারাও খালেদের সামরিক দক্ষতাকে অবমূল্যায়ন করল। উক্কাহ অহংকারভরে ঘোষণা করেছিলে, আরবদের মোকাবিলায় আরবরাই যথেষ্ট; পারস্য বাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন তাদের নেই।
দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে খালেদ একটি সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে, যখন উক্কাহ নিজের সৈন্যদের সারিবদ্ধ করতে ব্যস্ত, তখন খালেদ অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী নিয়ে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাকে বন্দি করে নিয়ে আসেন। নেতা বন্দি হওয়ায় আরব খ্রিষ্টান বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। এরপর খালেদ আইন তামরের দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গে আশ্রয় নেওয়া লোকদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। এভাবে আইনে তামরে সম্পূর্ণভাবে মুসলিমদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। আইন তামরের প্রশাসক হিসেবে উয়াইমির ইবনে কাহিল আসলামীর নিযুক্ত করেন।
দুমাতুল জানদাল
আইনে তামর জয় করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ দুমাতুল জানদালের দিকে এগিয়ে গেলেন। এখানে মুসলিম সেনাপতি ইয়াজ ইবনে গানাম অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন। খালেদের অগ্রযাত্রার সংবাদ পৌঁছাতেই দাউমাতুল-জানদালের শাসকরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল এবং বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যদের সমবেত করল।
এদিকে দাউমাতুল-জানদালে পৌঁছে খালেদ দেখতে পেলেন, শত্রুবাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদল তার মোকাবিলার জন্য এবং অন্যদল ইয়াজ ইবনে গানামের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আক্রমণ শুরু হলে উভয় বাহিনী মুসলিমদের হাতে পরাজিত হয়। পরাজিত সৈন্যরা দুর্গে আশ্রয় নিতে ছুটে গেলেও ভিড়ের কারণে ভেতরে যেতে পারে না। ফলে তারা মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এরপর খালেদ দুর্গের প্রবেশদ্বার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং দুমাতুল জানদালের পূর্ণ নিজের হাতে তুলে নেন।
এই বিজয় শুধু সামরিক সাফল্য নয়; কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এর অনেক গুরুত্ব ছিল। দুমাতুল জানদাল ছিল আরব উপদ্বীপ, ইরাক এবং শামের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে শহরটির অধিকার মুসলিমদের জন্য উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তকে নিরাপদ করে এবং ইরাক ও শামের মধ্যকার যোগাযোগপথকে সুরক্ষিত করে।
হুসাইদ বিজয়
দুমাতুল জানদাল বিজয়ের পরও ইরাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থেমে যায়নি। খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ অন্য অভিযানে ব্যস্ত থাকায় বহু অমুসলিম আরব ও পারসিক গোষ্ঠী মুসলিম শাসনকে দুর্বল মনে করে আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে, আইনুত তামরে নিহত উক্কাহর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে জোট করে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ সম্মিলিত বাহিনী প্রস্তুত করে।
এই উদ্দেশ্যে পারসিক সেনানায়করা তাদের বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অঞ্চল থেকে হুসাইদ ও খানাফিতে অবস্থানরত আরব মিত্রদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তাদের তৎপরতা মুসলিম গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যায়। হীরার শাসক কা’কা ইবনে আমর তাদের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা করেন।
খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ জানতে পারেন, হুসাইদে বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যরা পারসিক সেনাপতি রাওজাবার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। শত্রুকে আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি কাকা ইবনে আমরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সেখানে পাঠান এবং হীরার দায়িত্ব ইয়াজ ইবনে গনমের হাতে অর্পণ করেন। এদিকে জারমাহারের সহায়তায় রাওজাবাও পারসিক ও আরব বাহিনীকে একত্র করেন। হুসাইদের যুদ্ধে কাকার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। যুদ্ধে অনেক শত্রুসৈন্য নিহত হয়। এ বিজয়ের ফলে মুসলিমরা ইরাকে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নতুন জোট ও সম্ভাব্য বিদ্রোহের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়।
মুসাইয়াখ বিজয়
হুসাইদে বিজয়ের পর খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ উপলব্ধি করেন, ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরব ও পারসিক গোষ্ঠীগুলো দ্রুত দমন না করা গেলে তারা আবার একত্র হয়ে মুসলিমদের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। তাই তিনি তার অধীনস্থ সব কমান্ডারকে মুসাইয়্যাখ নামক স্থানে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। হাওরাতের নিকটবর্তী এ অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন একত্র হলে খালেদ তাদের সমন্বিত আক্রমণের পরিকল্পনা দেন। এরপর তিন দিক থেকে একযোগে অভিযান চালিয়ে তারা স্থানীয় প্রতিরোধশক্তিকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং শত্রুদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।
ফিরাজের লড়াই
ইরাকে ধারাবাহিক বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা যখন অধিকাংশ প্রতিরোধশক্তিকে দমন করতে সক্ষম হয়, তখন সেনাপতি খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ ফিরাজ অঞ্চলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। শাম, ইরাক ও আরব উপদ্বীপের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ফিরাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্তাঞ্চল। কৌশলগতভাবে এর নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য ছিল।
ফিরাজে মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি রোমানদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। মুসলিমদের দ্রুত অগ্রযাত্রা থামানোর উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং উভয় পক্ষ তাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে প্রথমবারের মতো মুসলিম বাহিনী একই যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরব—এই তিন শক্তির সম্মিলিত বাহিনীর মুখোমুখি হয়।
উভয় বাহিনী ফোরাত নদীর তীরে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। শত্রুপক্ষ মুসলিমদের নদী পার হয়ে আসার আহ্বান জানালে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ নিজ অবস্থানে অটল থেকে তাদেরই নদী পার হতে দেন। যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরবদের যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিমরা অসাধারণ সাহস ও শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়। তীব্র যুদ্ধের পর শত্রুজোট সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয় এবং বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। বিজয়ের পর খালেদ কয়েক দিন ফিরাজে অবস্থান করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেন।
হিজরি ১২ সালের জিলকদ মাসে সংঘটিত এই যুদ্ধ মুসলিমদের বিরুদ্ধে গঠিত বৃহত্তম জোটকে ভেঙে দেয় এবং ইরাকে মুসলিম কর্তৃত্বকে আরো সুদৃঢ় করে। ইতিহাসে এটি ইরাক অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। এটি ছিল ইরাকে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে পরিচালিত শেষ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ইসরাইলের সব অর্জন মুছে দিয়েছে