যে পীরের নাম কেউ জানে না, তার মাজারে আজও মানত করে শত শত মানুষ। তাহলে কে ছিলেন তিনি? আর কেন স্থানীয়রা তাকে শাহ সুলতান বলখীর শিষ্য বলে মনে করেন? ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা পথ ধরে হাঁটলে কখনো কখনো এমন কিছু জনপদের দেখা মেলে, যেখানে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। তেমনই এক প্রাচীন ভূখণ্ড উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন বা আজকের বগুড়া।
নবী ঈসা (আ.)-এর জন্মের প্রায় ৪০০ বছর আগে থেকেই এ অঞ্চলটি ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, নগরায়ণ আর বাণিজ্যের এক মহাসমুদ্র। মৌর্য, গুপ্ত, পাল আর সেন রাজাদের উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী এই মহাস্থানগড়। কিন্তু মহাস্থানের এই সুবিশাল দুর্গনগরীর ধ্বংসাবশেষের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি সমান্তরাল ইতিহাস। তা হলো এ অঞ্চলের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় রূপান্তরের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের খোঁজেই আমার এবারের গন্তব্য ছিল বগুড়ার কাহালু উপজেলার এক নিভৃত অঞ্চল ‘দরগার হাট’।
তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের অনেক আগে এই পুণ্ড্রভূমিতে ইসলামের আলো এসে পড়েছিল। তৎকালীন বাংলায় তখন চলছিল সেন রাজাদের কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন। জাত-পাতের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন আর প্রকৃতিপূজারি সাধারণ মানুষ। ইতিহাসে হয়তো এই পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের ওপর হওয়া সামাজিক নির্যাতনের কথা বিস্তারিত লেখা নেই, কিন্তু স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরা লোকগাথা আর মিথগুলোয় আজও সেই বঞ্চনার সুর স্পষ্ট। ঠিক এ ধরনের এক সামাজিক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলে আগমন ঘটে সুফি সাধকদের। তারা শুধু ধর্মের বাণী নিয়ে আসেননি, এসেছিলেন মানবিকতা ও সামাজিক সাম্যের বার্তা নিয়ে।
বগুড়ার ইসলামের বিস্তারের প্রধান নায়ক ধরা হয় মহাস্থানগড়ের মাজারের পুণ্যপুরুষ সুলতানুল আউলিয়া হজরত শাহ সুলতান বলখীকে। আনুমানিক দশম থেকে বারো শতকের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি এ অঞ্চলে আসেন। তিনি ছিলেন একাধারে সুফি সাধক এবং দূরদর্শী যোদ্ধা। স্থানীয় অত্যাচারী হিন্দু রাজাকে পরাজিত করে তিনি এ অঞ্চলে সুফিবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। তবে ইতিহাস বলে, শাহ সুলতান বলখী একা আসেননি। তার সঙ্গে এসেছিলেন একদল একনিষ্ঠ অনুসারী, সুফি ও অভিজ্ঞ সৈনিক। মহাস্থানগড়কে কেন্দ্রবিন্দু ধরে তারা ছড়িয়ে পড়েছিলেন পুণ্ড্রভূমির আনাচে-কানাচে। বখতিয়ার খিলজির আগমনের আগেই এই সুফি কাফেলা বাংলার মানুষের মন জয় করে বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। কাহালুর ‘দরগার হাটের মাজার’ সেই সত্যেরই এক জীবন্ত দলিল।
কাহালুর দরগার হাটে পৌঁছালেই চোখ জুড়িয়ে যায় রাস্তার পাশে থাকা এক বিশাল প্রাচীন দিঘি আর তার চারপাশে ঢেউখেলা সবুজ ধানের ক্ষেত দেখে। এই শান্ত পরিবেশের কোলেই শুয়ে আছেন শাহ সুলতান বলখীর অন্যতম প্রধান শিষ্য ও সহযোদ্ধা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুগের পর যুগ ধরে বংশানুক্রমিকভাবে স্থানীয় মানুষ এই মাজারকে ভক্তি করে এলেও, এই সুফি সাধকের নির্দিষ্ট কোনো নাম তাদের জানা নেই। তিনি এখানে ‘দরগার হাটের পীর’ নামেই পরিচিত। নাম না জানলে কী হবে, তার প্রতি মানুষের বিশ্বাস মোটেও কমেনি। লোকমুখে শোনা যায়, এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার এবং স্থানীয় মানুষের কল্যাণে, বিশেষ করে কৃষির পানির জন্য এই বিশাল দিঘি খননসহ নানা জনকল্যাণমূলক কাজে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই পারিপার্শ্বিক পরিবেশই প্রমাণ করে, তিনি পরকালে মুক্তির পাশাপাশি দুনিয়াতে মানুষের ‘অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানে’র অধিকার নিয়েও কাজ করেছিলেন।
বাংলার সুফিবাদের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র, যা দরগার হাটের এই মাজারে এলে খুব স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যায়। বগুড়ার অন্য মাজারগুলোর মতোই এখানেও রোগ-শোক, বিপদে-আপদে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছুটে আসে। মানত করে, শিরনি চড়ায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই যৌথ সংস্কৃতি প্রমাণ করে—এখানে ইসলামের বিস্তারের প্রক্রিয়াটি কোনো জোর-জুলুমের মাধ্যমে হয়নি; বরং সুফিদের উদারতা আর ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
সুফিদের এই নীরব বিপ্লবের প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তা বোঝা যায় ১৮৭২ সালের বাংলার প্রথম আদমশুমারির দিকে তাকালে। সেই সুদূর অতীতেই অবিভক্ত বাংলার সব জেলার মধ্যে বগুড়ার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল সর্বাধিক—প্রায় ৮১ শতাংশ! এমনকি এর আশপাশের জেলা পাবনা, রাজশাহী, রংপুর বা দিনাজপুরেও এই হার ছিল ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। এ সংখ্যাতত্ত্বই প্রমাণ করে পুণ্ড্রনগরের সুফি-সাধকদের হাত ধরে যে ধর্মীয় রূপান্তর ঘটেছিল, তা বাংলার সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি এবং ভূরাজনীতিতে কতটা বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
আজকের দরগার হাট সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে। মাজারের কোল ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে আধুনিক যুগের হাফিজিয়া কওমি মাদরাসা আর কিছুটা দূরেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ‘দরগাহ হাট ডিগ্রি কলেজ’। পাশ দিয়েই চলে গেছে বগুড়া থেকে সান্তাহারের জাতীয় সড়ক। প্রাচীন দিঘির শান্ত জল আর ফসলের মাঠের সবুজ আভা মাখিয়ে মাজারটি যেন প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন আর আধুনিক বাংলাদেশের এক চমৎকার সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মহাস্থানগড়ের মূল কেন্দ্র ছাড়িয়ে বগুড়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই নাম না জানা পীরদের মাজার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু রাজপ্রাসাদের দলিল বা বড় বড় যুদ্ধজয়ের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। আসল ইতিহাস লুকিয়ে থাকে মানুষের বিশ্বাসে, লোকগাথায় আর দরগার হাটের মতো নিভৃত প্রান্তরের মাটির গভীরে। সেই ইতিহাসের প্রতিটি ভাঁজের রহস্য আর শিকড়ের সন্ধান করতেই আমার এই পথ চলা—অবিরাম, অবিরত।
লেখক : লেখক ও গবেষক
email: sarkarraihan875@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

