ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশের পর এর শর্তগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের ছাড়ের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও ইরানের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি তুলনামূলক কম।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কঠিন আলোচনার পরও ইরানকে অতীতে যেসব সুবিধা দাবি করে এসেছে, তার অনেক কিছুই এই সমঝোতায় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইরান মূলত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিনিময়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে বলে সমালোচকদের দাবি।
চুক্তির কাঠামো: দুটি ধাপে বাস্তবায়ন
সমঝোতা স্মারকটি কার্যত দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে স্বাক্ষরের পরপরই কিছু বিষয় কার্যকর হওয়ার কথা। দ্বিতীয় ধাপে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন ছাড়
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরান সমুদ্রপথে বাধা সৃষ্টি করে এমন ব্যবস্থা সরিয়ে নেবে, যাতে ৩০ দিনের মধ্যে আগের মতো বাণিজ্যিক চলাচল ফিরে আসে।
তবে সমালোচকদের মতে, এর পরেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় ছাড় শুরু হয়।
চুক্তির একটি ধারা অনুযায়ী, স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইরান বছরে ৬০ থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ের বিষয়
সমঝোতার আরেকটি ধারা অনুযায়ী, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ও অর্থ উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত কি না, তা নিয়ে ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, ৬০ দিনের আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান?
চুক্তিতে ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা নতুন নয়।
আগের পরমাণু চুক্তি জেসিপিওএতেও ইরান একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে বর্তমান সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক উপকরণ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও দীর্ঘমেয়াদি পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে বিস্তারিত বাধ্যবাধকতা চূড়ান্ত চুক্তির জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল
সমঝোতায় ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ৬০ দিনের মধ্যে এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে, যা চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হতে পারে।
সমালোচকদের মতে, এর অর্থ হলো ইরান বড় ধরনের ছাড় পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়েই পরবর্তী আলোচনায় বসবে।
সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্ন
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি।
এর মধ্যে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিষয়ক পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই ছাড় শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে দেওয়া হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থানের তুলনায় অনেক বড় পরিবর্তন হবে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, ইরানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, মানবাধিকার পরিস্থিতি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিষয়ে চুক্তিতে স্পষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি
সমঝোতায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ অবসানের কথা বলা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা না থাকলে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই অনেক কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার ছেড়ে দিয়েছে। ফলে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে বর্তমান শান্তি উদ্যোগ কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সূত্র: সিএনএন
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


