নিজেদের বলতে একচিলতে জমিও নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে পাকা সড়কের পাশে টিন ও পলিথিনে ঘেরা ছোট্ট একটি ঝুপড়ি। পাঁচ বছর ধরে সেখানেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধ দম্পতি গুতু মন্ডল (৬০) ও সুন্দরী বেগম (৫৪)। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। সংসারে উপার্জনক্ষম বলতে এখন শুধু সুন্দরী বেগম। তাই প্রতিদিন ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়েই চলে দুজনের সংসার।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের জটিয়ারপাড়া-মাহমুদপুর বাজার সড়কের মহিষবাথান এলাকায় পাকা সড়কের পাশে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন গুতু মন্ডল ও সুন্দরী বেগম। ঘরের ভেতরে রয়েছে একটি ছোট বাংলা খাট ও কয়েকটি হাঁড়ি-পাতিল। ঘরের পাশেই রান্নার মাটির চুলা। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি ঢোকে। ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরটি টিকবে কি না, সেই শঙ্কাও থাকে সব সময়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুতু মন্ডলের বাবা সিরাজ জীবিত থাকতেই তাদের সব জমিজমা বিক্রি করে দেন। পরে দরিদ্র গুতু মন্ডল গাছ কাটার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় এখন আর কোনো কাজ করতে পারেন না। স্বামীর দেখভালের পাশাপাশি সংসারের খাবার জোগাড়ের দায়িত্বও এখন সুন্দরী বেগমের কাঁধে।
প্রতিদিন ভোরে ঘর থেকে বের হন সুন্দরী বেগম। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কখনো চাল, কখনো খাবার, আবার কখনো সামান্য টাকা পান। দিন শেষে যা জোটে, তা দিয়েই কোনো রকমে দুজনের খাবারের ব্যবস্থা হয়। তবে ওষুধ কেনার মতো অর্থ থাকে না।
আরও জানা গেছে, গুতু মন্ডলের প্রথম স্ত্রীর ঘরে একটি ছেলে রয়েছে। তবে সে বাবা ও সৎমায়ের খোঁজখবর নেয় না। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি সুন্দরী বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের কোনো সন্তান নেই। একসময় অন্যের বাড়িতে বসবাস করতেন তারা। প্রায় পাঁচ বছর আগে থাকার মতো কোনো জায়গা না থাকায় সড়কের পাশে ঝুপড়ি তুলে বসবাস শুরু করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসাইন বলেন, বৃদ্ধ দম্পতি খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের কোনো জায়গা-জমি নেই। সুন্দরী বেগম ভিক্ষা করে যা আনেন, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলে।
আরেক বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, অসহায় ও ভূমিহীন মানুষের জন্য সরকারের বিভিন্ন আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু এই দম্পতি এখনো স্থায়ী আবাসনের সুযোগ পাননি। সড়কের পাশে ঝুপড়িতে তাদের বসবাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কড়ইচড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, বৃদ্ধ দম্পতির বিষয়টি আগে জানা ছিল না। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকার স্থায়ী ব্যবস্থা করা যায় কি না, এ নিয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করব। সরকারি সহায়তা পেলে জীবনের শেষ বয়সে অন্তত ভিক্ষার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে তারা মুক্তি পেতে পারেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম খালেক বলেন, গুতু মন্ডল ও সুন্দরী বেগমের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় তাদের কী ধরনের সহযোগিতা করা যায় এবং নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, দরিদ্র বৃদ্ধ গুতু মন্ডল ও সুন্দরী বেগমের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

