ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করে চাপে ট্রাম্প

ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করে চাপে ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একই সময়ে তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষ বাড়ছে। এর সঙ্গে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধও যুক্ত হয়েছে। ফলে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুর্নীতির অভিযোগ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ট্রাম্প নিজেকে নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল প্রেসিডেন্ট হিসেবে তুলে ধরছেন। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি নিজের বেতন দান করেছেন। তিনি জানান, প্রথম মেয়াদেও তার ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বার্ষিক বেতন দান করেছিলেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদেও তা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

তবে এর পরদিনই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে। তার মেমকয়েন পরিচালনাকারী ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের মালিকানাধীন একটি ক্লাবে বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করে।

ওই আয়োজনে ট্রাম্প কয়েনের ১৮৫ জন বড় বিনিয়োগকারীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। শীর্ষ ২৯ বিনিয়োগকারীকে ট্রাম্পের সঙ্গে বিশেষ ভিআইপি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। শীর্ষ চার বিনিয়োগকারীর জন্য ছিল ট্রাম্পের নামসংবলিত ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ঘড়ি।

এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পের মেমকয়েনের বিক্রি বাড়ানো—এমন অভিযোগ উঠেছে। ট্রাম্প নিজেও এই মুদ্রা থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হন। নথি অনুযায়ী, গত বছর এই মুদ্রা থেকে তিনি প্রায় ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করেছেন।

ডেমোক্র্যাটরা বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক মাসের কিছু বেশি সময় আগে তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম ইস্যু করতে চাইছেন।

ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার ট্রাম্পকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একজন হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় রয়েছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এসব অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল এসব অভিযোগকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, ট্রাম্প সব সময় মার্কিন জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন এবং তার সিদ্ধান্তে কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই।

হোয়াইট হাউস বলছে, ট্রাম্প ওষুধের দাম কমানো, ওষুধ কেনার জন্য ‘ট্রাম্পআরএক্স ডটগভ’ চালু করা, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অন্যায্য বাণিজ্য বন্ধ করা এবং সরকারি প্রশাসনে সংস্কার আনার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন।

তবে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সরকারি দুর্নীতি নিয়ে আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত গ্যালাপের এক জরিপে ৮৯ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন, দেশে সরকারি দুর্নীতি ব্যাপক। গত তিন বছরে লেবানন, পেরু, ঘানা ও নাইজেরিয়ায় এ বিষয়ে উদ্বেগের হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দুর্নীতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন সিটিজেনস ফর রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড এথিকস ইন ওয়াশিংটনের কর্মকর্তা জর্ডান লিবোভিৎজ বলেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নৈতিকতার সংকট তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের নিজের আর্থিক নথি অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরে বিভিন্ন ব্যবসা থেকে তিনি প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। এর মধ্যে তার পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসা ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল থেকে এসেছে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

পর্যবেক্ষকেরা ট্রাম্প প্রশাসনে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের অন্তত তিনটি বড় ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন। এর একটি হলো ক্রিপ্টো ব্যবসা। কয়েক বছর আগেও ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সিকে ‘প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্র সরকারি কর্মকর্তাদের শেয়ার লেনদেন। এতে প্রেসিডেন্ট নিজেও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

তৃতীয় ক্ষেত্র হলো বিভিন্ন পূর্বাভাসভিত্তিক বাজার বা প্রেডিকশন মার্কেট। কালশি ও পলিমার্কেটের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের যোগাযোগ রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে সরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরার সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরকারি সিদ্ধান্ত থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ছাড়া ‘পে-টু-প্লে’ বা অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ধনী দাতারা ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার ও রাজনৈতিক সুপার প্যাককে অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে বিশেষ সুযোগ এবং অনুকূল সিদ্ধান্ত পেয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।

ট্রাম্পের ক্ষমা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার পুনর্নির্বাচনের প্রচেষ্টায় অর্থ দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমা বা সাজা কমিয়ে দেওয়ার সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি পর্যবেক্ষক সংগঠন প্রজেক্ট অন গভর্নমেন্ট ওভারসাইটের কর্মকর্তা ডিলান হেডলার-গডেট বলেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এত জটিল যে অনেক ভোটার বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। তার মতে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার পেছনে দুর্নীতির অভিযোগ ভূমিকা রাখলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

ক্যাম্পেইন লিগ্যাল সেন্টারের কর্মকর্তা ব্রেন্ডন ফিশার বলেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় মানুষ অনেকটা ‘অভ্যস্ত’ হয়ে গেছে। তার মতে, ট্রাম্পের ক্রিপ্টো ব্যবসা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ এর মাধ্যমে ধনী স্বার্থগোষ্ঠীগুলো প্রেসিডেন্টের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার নতুন সুযোগ পেতে পারে।

তবে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে জটিল। এর বিপরীতে কাতার থেকে ট্রাম্পের জন্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিমান গ্রহণের বিষয়টি সহজে বোঝা যায় বলে মনে করেন ফিশার। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি বিমানটি বর্তমান এয়ার ফোর্স ওয়ানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করবেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের হোয়াইট হাউসের নৈতিকতা বিষয়ক আইনজীবী রিচার্ড পেইন্টার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ তুলেছেন। তার মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর স্বার্থের সংঘাতের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার দাবি, ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প এমন ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন, যারা সরকারি চুক্তি পেয়েছে।

পেইন্টার বলেন, যুদ্ধের সময় বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, মার্কিন ইতিহাসে এই প্রথম এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যেখানে কোনো প্রেসিডেন্টের পরিবার সামরিক-শিল্প খাত থেকে সরাসরি অর্থ উপার্জন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জনঅসন্তোষ তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি রয়েছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদেরও নৈতিকতার প্রশ্নে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে হবে। কারণ জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকার সময় তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেন হোয়াইট হাউসে বাবার রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটরা যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নেয়নি বলে তার মন্তব্য।

পেইন্টার ১৯৭৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উদাহরণও টেনেছেন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের মধ্যে জিমি কার্টার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছিলেন।

ডেমোক্র্যাটরা সাম্প্রতিক সময়ে হাঙ্গেরির উদাহরণও সামনে আনছে। চলতি বছরের এপ্রিলে হাঙ্গেরিতে পিটার মাগিয়ার সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন ভিক্টর অরবানকে পরাজিত করেন। অরবান ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিৎসকি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও হাঙ্গেরির পরিস্থিতির মধ্যে একটি মিল হলো—সরকারের প্রতি আস্থার সংকটের সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ যুক্ত হওয়া। তার মতে, কোনো সরকার অর্থনীতি ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারলে কিংবা মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলে ভোটাররা অনেক সময় দুর্নীতির বিষয়টি উপেক্ষা করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক দুরবস্থার সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ যুক্ত হলে বিষয়টি ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

লেভিৎসকির মতে, বর্তমানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার পেছনে দুর্নীতি একটি কারণ হলেও এটিকে প্রধান কারণ বলা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অর্থের বড় ভূমিকা থাকার কারণে অনেক মানুষ পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করেন। ফলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ কতটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, তা নির্ভর করবে ভোটাররা বিষয়টি কীভাবে দেখছেন এবং বিরোধীরা তা কতটা সহজভাবে তুলে ধরতে পারছেন তার ওপর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন