২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার গঠিত হওয়ার প্রথম ৬ মাসে প্রায় ৫০ হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রায় ১৭ হাজার বিনিয়োগকারী বাজারে যুক্ত হয়েছেন। অপরদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিজয়ী বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর যুক্ত হওয়া বিনিয়োগকারীর সংখ্যা সাড়ে আট হাজারের মতো। এ হিসাবে প্রথম ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বিএনপি সরকারের আমলে যুক্ত হওয়া বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ কম।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আবশ্যকীয় বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। শেয়ারবাজার বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ও শেয়ারের তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সেন্ট্রাল ডিপোজেটরি পার্টিসিপেন্ট অব বাংলাদেশ (সিডিবিএল)।
সিডিবিএলের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি বিও অ্যাকাউন্টধারী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৫১৮ জন। প্রথম ছয় মাস শেষে ৬ জুলাই এ সংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৮৩৮-তে। এ হিসাবে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হওয়ার প্রথম ৬ মাসে শেয়ারবাজার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ৪৯ হাজার ৬৮০ জন বিনিয়োগকারী। এ সময়ে নতুন বিও হিসাব খোলার সংখ্যা হচ্ছে ১ লাখ ৪১ হাজার ১৫৮টি। পক্ষান্তরে বিও হিসাব বন্ধ হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৩৮টি।
অপরদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ও ভারতে পলায়নের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম ৬ মাসে ১৬ হাজার ৯৬০ জন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণের দিন শেয়ারবাজারে বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯৫ জন। প্রথম ৬ মাস শেষে ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিও হিসাবধারীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫৫-তে। এ সময় নতুন বিও হিসাব খোলা হয়েছে ৩৯ হাজার ১৭২টি এবং বন্ধ হয়েছে ২২ হাজার ২১২টি। এ হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ১৬ হাজার ৯৬০-এ।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি সরকার। সরকার গঠনের দিন দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৬ জন। ৬ মাসের ব্যবধানে ১৬ আগস্ট এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৬তে। এ সময়ে নতুন বিও হিসাব খোলার পরিমাণ ৫৫ হাজার ৮১৪টি। বিপরীতে হিসাব বন্ধ হয়েছে ৪৭ হাজার ২৪৪টি। এ হিসাবে বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাসে নতুন করে শেয়ারবাজারে যুক্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৫৭০ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ৬ মাসের তুলনায় বিএনপি সরকারের একই সময়ে বিও হিসাবের বৃদ্ধির সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার গঠনের সঙ্গে শেয়ারবাজারে বিও হিসাব খোলার মধ্যে একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এটি এককভাবে সরকার গঠনের উপর নির্ভর করে না। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের আর্থিক নীতি, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতি, নতুন আইপিও অনুমোদন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে কারা রয়েছেনÑএসব কিছু ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে। আবার প্রতি বছর জুন মাসে বিও হিসাব নবায়ন করতে হয়। এজন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু ফি পরিশোধ না করলে বিও হিসাব স্থগিত করে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাস সময়কালে জুন-ক্লোজিংয়ের ইস্যু জড়িত রয়েছে। ফলে জুন ক্লোজিংয়ের কারণেও বিও অ্যাকাউন্ট একটা প্রভাব থাকতে পারে।
এদিকে বিএনপি সরকার গঠন করলেও বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে প্রায় চার মাস পর। করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খানকে গত ৪ জুন বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চেয়ারম্যানের পাশাপাশি তিন কমিশনারকেও নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকার গঠনের পর বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয়ে সময় ক্ষেপনেরও প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্ট বিভাগের শিক্ষক ও পুঁজিবাজার সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্সের সাবেক সদস্য অধ্যাপক আল-আমিন আমার দেশকে বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আসা-যাওয়ার চেয়ে মার্কেট কতটা স্ট্যাবল সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আইপিওতে লটারি পদ্ধতির কারণে বিও হিসাবের সংখ্যা বাড়ে। যত বেশি আবেদন আইপিওর লটারি জেতার সম্ভাবনা তত বেশিÑএমন প্রত্যাশায়ও অনেকে বিও অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার কারণে কিংবা অন্য আরো অনেক কারণে যেমন অনেকে বাজার ছেড়ে গেছেন আবার নতুন প্রত্যাশায় অনেকেই শেয়ারবাজারে আসছেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আমলে দেশের শেয়ারবাজারে নজিরবিহীন কেলেংকারির ঘটনা ঘটে। এতে কয়েক লাখ বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। কিন্তু কারসাজি চক্রের হোতাদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর শেয়ারবাজারে সেই দুঃসহ স্মৃতি ফিরে আসে সাধারণ বিনিয়োগকারীর মানসপটে। বাজার সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করছেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী আমলে শেয়ারবাজারে কেলেংকারির ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ২০০৯ সালের প্রথম দিকে বাজার ছেড়ে চলে যান প্রায় ৫০ হাজার বিনিয়োগকারী।
প্রথম ৬ মাসে বিও হিসাবের সংখ্যা কমলেও এরপর ধীরে ধীরে তা বাড়তে শুরু করে। ব্যাংকের সুদের হার কমানো, ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সীমা বৃদ্ধি, ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি না ঘটার আশ্বাসসহ নানাভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০১০ সালে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩২ লাখ ৮০ হাজারে। বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর আগমনের সুযোগে কারসাজির চক্রের হোতারা শেয়ারবাজারকে অর্থ লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ১৯৯৬ সালের চেয়ে আরো বড় ধরনের কেলেংকারি ও বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে। ধসের কারণে পুঁজি হারিয়ে কয়েকজন বিনিয়োগকারী আত্মহত্যাও করেছেন। এখনো সেই বিপর্যয়ের ধকল থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না বাজার। বিশেষ করে মার্জিন লোনের কারণে শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীই নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
শেয়ারবাজার থেকে আওয়ামী লীগের আমলে এক লাখ কোটি টাকা লুটপাট বা আত্মসাত হওয়ার তথ্য অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে তৈরি বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা সম্পর্কিত শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও পূর্ববর্তী সরকারের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি তুলে ধরার জন্য ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


