নতুন বাধার মুখে ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিকল্পনা

নতুন বাধার মুখে ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিকল্পনা

আগামী দুই দশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১০ গুণ বাড়ানোর ভারতের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নতুন বাধার মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিদেশি প্রযুক্তিতে তৈরি পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন খসড়া নীতিতে কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়া রাখায় বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

ভারত আগামী ২০৪৫ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করতে চায়। এ লক্ষ্যে প্রায় ২১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে দেশটির বিদ্যুতের বড় অংশ কয়লাভিত্তিক হওয়ায় কার্বন নিঃসারণ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে নয়াদিল্লি।

বিজ্ঞাপন

ভারতের নতুন পরমাণু আইন গত বছর দেশটির দীর্ঘদিনের কঠোর নিয়ন্ত্রিত খাতটি বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার পথ তৈরি করে। দেশটির লক্ষ্য ছিল বিদেশি প্রযুক্তি, পুঁজি ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত খসড়া বিধিমালায় বিদেশি চুল্লির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত রাখা হয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী, বিদেশি নকশার কোনো পারমাণবিক চুল্লি ভারতে স্থাপনের আগে সেটিকে উৎপত্তি দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে হবে এবং ওই নকশার চুল্লি উৎপত্তি দেশ বা অন্য কোনো দেশে বাস্তবে চালু থাকতে হবে। পাশাপাশি ভারতে নির্মাণ শুরুর আগে দেশটির পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকেও আলাদা নকশা অনুমোদন নিতে হবে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই শর্তের কারণে নতুন প্রজন্মের অনেক প্রযুক্তি ভারতে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লি বা এসএমআর প্রযুক্তি এ কারণে বড় বাধার মুখে পড়তে পারে। বিশ্বের অনেক এসএমআর নকশা এখনো বাণিজ্যিকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে সেগুলো ভারতে ব্যবহারের যোগ্যতা অর্জন করতে সময় লাগতে পারে।

ভারতের পারমাণবিক খাতে ইতোমধ্যে টাটা পাওয়ার, আদানি পাওয়ার ও রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় ভারতীয় কোম্পানি এবং রাশিয়ার রোসাটম, ফ্রান্সের ইডিএফ ও যুক্তরাষ্ট্রের জিই হিটাচির মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে। তবে নতুন বিধিমালার চূড়ান্ত রূপ না পাওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ভারতের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী ও প্রযুক্তি-ধারক প্রতিষ্ঠান এনপিসিআইএল ইতোমধ্যে ২০৩২ সালের মধ্যে প্রায় ১৪ গিগাওয়াট সক্ষমতা বাড়ানোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সরকারের ১০০ গিগাওয়াটের লক্ষ্যে পৌঁছাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিদেশি প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আইন বিশেষজ্ঞ সুহান মুখার্জি বলেন, বিদেশি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এমন শর্ত আরোপ করা হলে ভারতের নতুন পরমাণু আইন যে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করেছিল, তা অনেকটাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তার মতে, বিশেষ করে বাণিজ্যিকভাবে এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি এমন প্রযুক্তি এই ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়বে।

তবে ভারতীয় সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে এবং এগুলো আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়ার পর আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশের কথা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা ও দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। বিদেশি প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলে বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ কমতে পারে। আবার নিরাপত্তা যাচাই শিথিল করাও পারমাণবিক বিদ্যুতের মতো সংবেদনশীল খাতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে ভারতের ১০০ গিগাওয়াটের লক্ষ্য কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে চূড়ান্ত বিধিমালার ওপর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন