মারাত্মকভাবে আর্থিক সংকট ও অনিয়মে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসিকে ঘুরে দাঁড়াতে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সভায় জানানো হয়, ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি (এনপিএল) হয়ে পড়েছে, যা সামগ্রিক ব্যাংক খাতের জন্য এক বিরাট উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া ব্যাংকটির মূলধন ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং চরম নেতিবাচক নিট ইন্টারেস্ট মার্জিন বা নেতিবাচক এনআইএমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভোগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তাও ছিলেন। বৈঠকে আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—বড় শ্রেণিকৃত অ্যাকাউন্টগুলোর দ্রুত সুরাহা করা; খেলাপি ঋণের হার ও পরিমাণ উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা; নতুন বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা; এসএমই, কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে গুণগত ঋণ বিতরণ বাড়ানো; অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স কালচার আরো শক্তিশালী করা।
সভা সূত্র জানিয়েছে, খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ অল্পসংখ্যক প্রভাবশালী গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এসব বড় অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করে সময়াবদ্ধ ও আলাদা রেজুলুশন প্ল্যান তৈরি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা মওকুফ নয়, ব্যাংকের তারল্য ও আয় বাড়াতে নগদ অর্থ আদায়কে আলাদা কেপিআই হিসেবে যুক্ত করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া ওভারডিউ এক্সপোর্ট বিল এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং ঝুঁকি এড়াতে আরো কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুবাই বা ইউএই অপারেশন টিকিয়ে রাখা কিংবা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বন্ধ করার বিষয়ে দ্রুত পর্ষদকে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়েছে।
উচ্চ ব্যয়ের আমানতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কম খরচে স্থিতিশীল আমানত ও প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব বাড়াতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি মূলধন পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। আটকে থাকা বড় মামলাগুলোর আইনি অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করা এবং প্যানেল আইনজীবীদের পারফরম্যান্স রিকভারির ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে জনতা ব্যাংককে দ্রুততম সময়ে ‘কৃষক কার্ড’ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’প্রস্তুত এবং বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আগামী এক থেকে দুবছরের জন্য জনতা ব্যাংককে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বড় শ্রেণিকৃত অ্যাকাউন্টগুলোর দ্রুত সুরাহা করা, খেলাপি ঋণের হার ও পরিমাণ উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা, নতুন বড় ঋণ এড়িয়ে এসএমই, কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে গুণগত ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স কালচার আরো শক্তিশালী করা।
এছাড়া বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে এমন একটি বাস্তবসম্মত ও পরিমাপযোগ্য রূপরেখা তৈরি করতে হবে, যেখানে স্পষ্ট থাকবে কী করা হবে, কে করবে, কতদিনের মধ্যে করবে এবং এর ফলাফল কী হবে।
জনতা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান এম ফজলুর রহমান আমার দেশকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনার আলোকে আমরা কার্যক্রম শুরু করেছি। আশা করি আগামীতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

