প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ

প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষার পর বেইজিংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। চীনের দ্রুত সামরিক আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় এ ঘটনাকে সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগে, দুই বছর আগে চীন ফরাসি পলিনেশিয়ার কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালিয়েছিল। চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সেটিই ছিল প্রথম উৎক্ষেপণ।

বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ এই পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা আরও বেড়েছে—এমন ইঙ্গিত দেয়। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে, তবুও ওয়াশিংটন এখনো চীনকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে।

ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করছে, তখন চীন ঠিক তার বিপরীত পথে হাঁটছে।’

তিনি বলেন, ‘বেইজিংয়ের দ্রুত ও অস্বচ্ছ পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ এ অঞ্চল এবং পুরো বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।’

চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করে নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির দাবিতে যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান সর্বশেষ বড় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ শেষ হতে দেয়।

তবে রাশিয়ার তুলনায় চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার অনেক ছোট হলেও তা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব চীন প্রত্যাখ্যান করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর চীনের প্রতি ‘অর্থবহ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংলাপে’ অংশ নেওয়ার এবং সব আন্তঃমহাদেশীয় পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ উৎক্ষেপণ সম্পর্কে নিয়মিত আগাম অবহিতকরণ ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানায়।

চীনের দাবি করা স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান ক্ষেপণাস্ত্রটিকে জেএল-২ হিসেবে শনাক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা অন্তত ৮ হাজার কিলোমিটার।

তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব জোসেফ উ বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি ফিলিপাইনের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, চীন এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘চীন আবারও প্রমাণ করল যে, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দাদাগিরি করা দেশ তারাই।’

দক্ষিণ চীন সাগরে ভূখণ্ড নিয়ে চীনের সঙ্গে বারবার উত্তেজনায় জড়ানো ফিলিপাইনও এ পরীক্ষার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই উৎক্ষেপণের কোনো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য নেই। এটি চীনের অবৈধ সম্প্রসারণবাদ ও জবরদস্তিমূলক আচরণ প্রত্যাখ্যানকারী দেশগুলোর প্রতি হিসাবকৃত উসকানি ও শক্তি প্রদর্শন।’

প্রশান্ত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা

নিউজিল্যান্ড জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে চীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে এ বিষয়ে অবহিত করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রকেও আগাম জানানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

চীনের নৌবাহিনীর মুখপাত্র ওয়াং শুয়েমেং উইচ্যাটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেন, এ উৎক্ষেপণ ‘চীনের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ’ এবং ‘সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগেই জানানো হয়েছিল।’

পর্যবেক্ষকদের মতে, পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি সাবমেরিন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত সলোমন দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি সাগরে পড়েছে। ২০২২ সালে দেশটি চীনের সঙ্গে একটি গোপন নিরাপত্তা চুক্তি করেছিল, যা বর্তমানে নতুন সরকার পুনর্বিবেচনা করছে।

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেন, চীনের এ পরীক্ষা ‘এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য অশুভ’।

জাপান জানায়, উৎক্ষেপণের বিষয়ে তাদের আগেই জানানো হয়েছিল। তবে তারা চীনকে এ ধরনের পদক্ষেপ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে এবং বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে।

চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া এ পরীক্ষাকে বেইজিংয়ের ‘সার্বভৌম অধিকার’ বলে অভিহিত করে বলেছে, ‘চীন বিশ্বের কারও জন্য হুমকি নয়।’

এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লাইল মরিস বলেন, এই পরীক্ষা দেখিয়েছে যে স্থলভিত্তিক উৎক্ষেপণের বাইরে সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতাও দ্রুত বাড়াচ্ছে চীন।

তিনি বলেন, ‘এত দীর্ঘ পাল্লার একটি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, চীন আরও টেকসই ও দীর্ঘপাল্লার সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে।’

তার মতে, এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, চীনের নৌবাহিনী নিজস্ব জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার সক্ষমতা অর্জন করছে।

একই দিনে অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। ২০২২ সালে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে চীনের বিতর্কিত নিরাপত্তা চুক্তির পর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র অস্ট্রেলিয়া এ উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও অস্ট্রেলিয়া-ফিজি প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের মতে, এ ধরনের সামরিক পরীক্ষা সাধারণত অনেক আগেই পরিকল্পনা করা হয়।

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...