চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দেশটির সামরিক প্রস্তুতিতে সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে একই সঙ্গে এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সেনাবাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করছেন বলেও মনে করছেন তারা।
তাইওয়ান প্রণালি এবং পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক তৎপরতা ও আধুনিকায়ন যখন বাড়ছে, ঠিক তখনই পিএলএর শীর্ষ নেতৃত্বে একের পর এক পরিবর্তন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো থেকে দুই জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা জিয়াং ইউক্সিয়া ও লিউ ঝেনলিকে বহিষ্কারের খবর সামনে এসেছে। জিয়াং ছিলেন শি জিনপিংয়ের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগী এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) ভাইস চেয়ারম্যান। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সর্বশেষ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাত সদস্যের সিএমসিতে বর্তমানে পাঁচটি পদই শূন্য রয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেমস চার বলেন, শি জিনপিং চীনের সামরিক কাঠামোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রাখবেন—এ বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। তার ভাষ্য, পিএলএর ওপর যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, শেষ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির ওপরও তার প্রভাব থাকবে।
তবে বেইজিংভিত্তিক গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনস্টিটিউশনের প্রেসিডেন্ট তিয়েন শিচেনের মতে, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভিত্তি, অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সামগ্রিক যুদ্ধসক্ষমতাকে দুর্বল করার বদলে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বড় ধরনের এই রদবদলের মধ্যেও চীন নিয়মিত প্রতিরক্ষা কার্যক্রম, অস্ত্র পরীক্ষা ও সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে পিএলএর সক্ষমতা কতটা অক্ষুণ্ন রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জিয়াং ইউক্সিয়া ছিলেন পিএলএর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একজন, যার ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল।
লন্ডনভিত্তিক টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ নীতি উপদেষ্টা রুবি ওসমান বলেন, পিএলএর শীর্ষ পর্যায়ে এত বড় পরিবর্তনের ফলে তাইওয়ানের মতো জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনায় কোনো সমস্যা হবে না—এমনটা ধরে নেওয়া কঠিন। তবে তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে সামরিক শৃঙ্খলা ও যুদ্ধপ্রস্তুতি বাড়ানোর জন্য শি জিনপিং এই সাময়িক বিঘ্নকে গ্রহণযোগ্য মূল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন।
চলমান অভিযানে পিএলএর রকেট ফোর্সের অস্ত্র ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সাবেক চীনা প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা তিয়েন শিচেন বলেন, চীনা সামরিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো সেনাবাহিনীর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা।
চীনের সরকারি পত্রিকা পিএলএ ডেইলির এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, জিয়াং ও লিউ এমন দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অপরাধে জড়িত ছিলেন, যা সেনাবাহিনীর ওপর দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৭ সালের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় কমিউনিস্ট পার্টির পরবর্তী কংগ্রেসের আগে সিএমসির শূন্য পদগুলো পূরণ নাও করা হতে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জার্মান মার্শাল ফান্ডের ইন্দো-প্যাসিফিক কর্মসূচির প্রধান বনি গ্লেসার বলেন, এই সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো শি জিনপিং এককভাবে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে একই সঙ্গে সিএমসি ও যৌথ স্টাফের মাধ্যমে পিএলএ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে পারবে।
ফলে শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন চীনের তাৎক্ষণিক যুদ্ধপ্রস্তুতিতে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও, এর মধ্য দিয়ে শি জিনপিংয়ের সেনাবাহিনীর ওপর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ আরো দৃঢ় হওয়ার চিত্রই স্পষ্ট হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


