এক পয়সার দান দিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। তারপর স্থানীয় মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় গড়ে ওঠে সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১১৯ বছরের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে সেটিই এখন হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি স্কুলই নয়, এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাসেরও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯০৭ সালে মাইনর স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টির ভিত্তি নির্মাণে স্থানীয় মানুষের ছিল অসাধারণ অবদান।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে ঘিরে একটি হৃদয়ছোঁয়া জনশ্রুতি এখনো স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এতে বলা হয়, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে যখন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বৈঠক করছিলেন, তখন ভবঘুরে ক্যাশো পাগলি নামের এক নারী তার কাছে থাকা এক পয়সা বিদ্যালয়ের জন্য দান করেন। একই সঙ্গে তিনি ওই স্থানেই বিদ্যালয় গড়ে তোলার অনুরোধ জানান। স্থানীয়দের বিশ্বাস, ওই এক পয়সার দানই ছিল বিদ্যালয়ের প্রথম অনুদান। পরে স্থানীয় অনেকেই জমি ও নগদ অর্থ দান করেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মোবারক সরকার প্রায় আট বিঘা জমি ও সাত হাজার টাকা, লোকমান সরকার দুই একর জমি; আজগর সরকার, মোফাজ্জল, আলতাফ হোসেন, আব্দুস সামাদ ও ঘেতা সরকার তিন বিঘা করে জমি, মোহাম্মদ আলী দুই বিঘা জমি এবং সাবেক চেয়ারম্যান সেকান্দর আলী চৌধুরী পাঁচ হাজার টাকা করে দান করেন। এ ছাড়া ঝাড়কাটা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও জমি এবং অর্থ দিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন।
বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন ময়মনসিংহের আবুল হোসেন। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো মেট্রিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। শুধু পাঠদান নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও বিদ্যালয়টির রয়েছে উজ্জ্বল সুনাম। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা কৃতিত্ব অর্জন করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বিদ্যালয়ের অনেক সাবেক শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রেখেছিলেন।
দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অসংখ্য কৃতী মানুষ উপহার দিয়েছে। এ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কামরুল হাসান কমল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আব্দুল হালিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আকিল আহমেদ, সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল মোস্তাকিম বিল্লাহ, জামালপুর জিলা স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক সোলাইমান, আছাদুল্লাহ, জামালপুর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন ও বাতরোগ বিশেষজ্ঞ) ডা. কবিরুল হাসান বিন রকীব (মুক্তা); নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. মেহেদী হাসান এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম হারাইসহ আরো অনেকে। বিদ্যালয়টির শতাধিক সাবেক শিক্ষার্থী বর্তমান সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য দুটি তিনতলা ও একটি একতলা একাডেমিক ভবন রয়েছে। পাশাপাশি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১৩ শিক্ষক ও ৬ জন কর্মচারী রয়েছেন। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয় থেকে ৪৭ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর আগের বছর ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ৫০ জন।
বিদ্যালয়টির অবদানের কথা উল্লেখ করে স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের গর্ব ও বিশ্বাসের নাম। বিদ্যালয়টির হাজারো শিক্ষার্থী সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আনিছুর রহমান বলেন, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। আমাদের সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, চিকিৎসা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সবার সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও সাফল্যের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশাবাদী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


