ফিলিস্তিনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান প্রত্যাখ্যান শান্তির বিকল্প নয়

ফিলিস্তিনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান প্রত্যাখ্যান শান্তির বিকল্প নয়

ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিতে হবে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ জ্যাক পোলানস্কিকে। একই সঙ্গে ইহুদি সদস্যদের আশ্বস্ত করতে হবে এবং মতপার্থক্য সামলানোর সক্ষমতা তার দল গ্রিন পার্টির আছে—এটিও দেখাতে হবে।

গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পবিত্র ভূমিতে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে নিউইয়র্ক ঘোষণাকে ১৪২ ভোটে ১০ ভোটের ব্যবধানে অনুমোদন করে। বিপক্ষে ভোট দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিও মূলত জাতিসংঘের ২০০২ সালের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাব। ওই প্রস্তাবে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন—দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে সমর্থন করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তৎকালীন সৌদি যুবরাজও বলেছিলেন, শান্তির জন্য ‘সমান দুটি পক্ষ’ প্রয়োজন। ‘নিপীড়ন ও অপমানের’ ওপর শান্তি টিকে থাকতে পারে না। তার ওই বক্তব্য তখন যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, এখনো তেমনই প্রাসঙ্গিক।

কিন্তু এখন যুক্তরাজ্যের গ্রিন পার্টি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক কাঠামো প্রত্যাখ্যান করে এক রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। শান্তির জন্য বাস্তবতাকে স্বীকার করা প্রয়োজন। গাজা ও পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো বলছে, ১৯৬৭ সালের সীমানাভিত্তিক দুই রাষ্ট্রের সমাধানের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। বিপরীতে সমান অধিকার নিশ্চিত করে একটি একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন মাত্র ১০ শতাংশ।

ইউরোপীয় গ্রিনরাও তাদের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সহযোগী দলের এই নতুন অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়। ইউরোপজুড়ে গ্রিন দলের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই নীতি আগে গৃহীত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইউরোপীয় গ্রিনরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার’ নিন্দা করেছে এবং ইসরাইল সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।

রাজনীতিবিদেরা বলছেন, বর্তমানে জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ব্যবস্থা অসম আইন প্রয়োগ করছে এবং ফিলিস্তিনিদের ‘নিম্নতর শ্রেণির’ নাগরিকে পরিণত করছে। আন্তর্জাতিক ঐকমত্য এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে পারেনি। এমনকি ইসরাইলের হামলায় গাজার প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসও ঠেকাতে পারেনি। তবে সমান অধিকারভিত্তিক একটি ‘একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরো দূরের বিষয় বলে মনে হচ্ছে।

সংকট যত গভীর হচ্ছে, শান্তির জন্য নতুন করে ভাবার প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে কনফেডারেশন বা রাষ্ট্রগুলোর একটি যৌথ কাঠামোর মতো মডেল নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের যেকোনো সমাধানের চূড়ান্ত পরীক্ষা হওয়া উচিত—তা কোনো একটি গোষ্ঠীর আধিপত্যের অবসান ঘটাতে পারে কি না এবং উভয় জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও নিরাপদ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে কি না।

গ্রিন পার্টির সম্মেলনে বিতর্কিত নীতিগুলো গ্রহণের সিদ্ধান্ত মাত্র প্রায় ২০০ ভোটে হয়েছে। দলের মোট সদস্যসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা এক-হাজার ভাগেরও কম। দলটির নেতা জ্যাক পোলানস্কি নিজেও ইহুদি। ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বার্ষিকীর সময় তাকে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ ঘিরে বিতর্কে জড়াতে হয়েছে। একই সময়ে তিনি লন্ডনে একটি উপনির্বাচনে লড়াইও করছেন।

গ্রিন পার্টির গৃহীত প্রস্তাবে জায়নবাদকে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে ‘অ-ইহুদি জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া এবং/অথবা তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তবে ইহুদি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ এর সঙ্গে একমত নন। তাদের কাছে জায়নবাদ মূলত ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বোঝায়।

এ নিয়ে ক্ষোভ বাস্তব এবং তা বোঝার মতো। এর বাস্তব প্রভাবও পড়তে পারে। গ্রিন পার্টির নীতিতে এমন একটি মতাদর্শকে বর্ণবাদী বলা হয়েছে, যার সঙ্গে অধিকাংশ ইহুদি মানুষ নিজেদের পরিচয় যুক্ত করেন। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, কেউ জায়নবাদী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলে তিনি গ্রিন পার্টিতে থাকতে পারবেন কি না।

জায়নবাদী হিসেবে পরিচিত ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ঠেকাতে যে সুরক্ষা প্রস্তাব করা হয়েছিল, গ্রিন পার্টির প্রতিনিধিরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন, জায়নবাদী বিশ্বাস সমতা-সংক্রান্ত আইনের অধীনে সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য হতে পারে।

সোমবার পোলানস্কি অবশ্য বলেছেন, ধর্মীয় বা সম্প্রদায়গত পরিচয়ের কারণে গ্রিন পার্টির কাউকে বাদ দেওয়া বা তার সঙ্গে যোগাযোগ না করার নীতি তিনি সমর্থন করেন না। এখন দেখার বিষয়, দলটি বাস্তবে এই অবস্থান কতটা কার্যকর করে।

গ্রিন পার্টির নতুন নীতির শেষ পর্যন্ত কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিপুলসংখ্যক সদস্যের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে গ্রিন পার্টির সাংগঠনিক কাঠামোতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন—এটি স্পষ্ট। লন্ডন অ্যাসেম্বলির সদস্য পোলানস্কি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পাঁচজন গ্রিন এমপির সঙ্গে যোগ দিতে চান। সে লক্ষ্য অর্জনে তাকে রাজনৈতিকভাবে আরো পরিণত ও সতর্ক ভূমিকা দেখাতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন