রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে হবে

রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে হবে

ফ্রান্সে একটি প্রজন্ম নজিরবিহীন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অথচ তাদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাব্যবস্থা অর্থসংকটে জর্জরিত। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দাবি ও উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে শোনা উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের।

১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের অন্যতম বিখ্যাত স্লোগান ছিল—‘কল্পনাকে ক্ষমতায় আনো’। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতার মধ্যে ওই প্রজন্ম বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তারা নিজেদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের সামাজিক বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

প্রায় পাঁচ দশক পর পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখন ভিন্ন। দেশজুড়ে স্কুলে অচলাবস্থা তৈরি করা কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর অধিকাংশের লক্ষ্যও এখন তুলনামূলকভাবে সীমিত। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমি চাই আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করে গণিতের পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা করতে।’

মঙ্গলবারের বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এতে শিক্ষার্থী ছাড়াও বহু অভিভাবক ও শিক্ষক ছিলেন। বিক্ষোভে মানুষের ক্ষোভের গভীরতা স্পষ্ট হয়েছে। বছরের পর বছর বাজেট কমানোর কারণে স্কুলের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক-কর্মচারীর ঘাটতি রয়েছে।

এ ছাড়া মে ও জুন মাসে ঘন ঘন তাপপ্রবাহের কারণে শ্রেণিকক্ষ অসহনীয় হয়ে উঠলেও তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও অর্থের অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ ও অ্যালগরিদমনির্ভর বাছাইপ্রক্রিয়াও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ।

জলবায়ু সংকট থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব—এমন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি একটি প্রজন্ম। তাদের উদ্বেগের মুখে এমানুয়েল মাখোঁ সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর। বিক্ষোভকারীদের বেশিরভাগই অল্পবয়সী হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীকে স্কুলের ‘অবরোধ’ ভাঙতে হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে সংঘাত আরো বেড়েছে এবং উভয় পক্ষের সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এ পর্যন্ত ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য এবং কয়েকজন শিক্ষকও। লঁস শহরে একটি বিক্ষোভের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিস্ফোরণে উড়ে যায়। আরেকজন চোখ হারায়। ৪ হাজারের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও শিক্ষা খাতে অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে এই ক্ষোভ ম্যাক্রোঁ সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির দুর্বলতা সামনে এনেছে। ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি কমানো এবং ক্রমবর্ধমান অস্থির বন্ডবাজারকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে ম্যাক্রোঁর দ্বিতীয় মেয়াদে একের পর এক সরকার কঠোর ব্যয় সংকোচনের বাজেট বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। এই সময়ে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু অবশ্য দেরিতে হলেও বলেছেন, শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

কিন্তু গত মাসেই লেকর্নু ৫৪ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর মধ্যে স্কুলশিক্ষায় প্রকৃত অর্থে বরাদ্দ কমানোর বিষয়টিও ছিল। অথচ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন ছিল আরো বেশি অর্থ, কম নয়।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি। এই নির্বাচনে মেরিন ল্য পেনকে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমন সময়ে স্কুলে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার দৃশ্য উদ্বেগজনক। মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থার সংকটের মধ্যে ফরাসি রাজনীতি আরো মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে। ল্য পেন অভিযোগ করেছেন, উগ্র বামপন্থীরা স্কুলের বিক্ষোভে উসকানি দিচ্ছে। তিনি ‘দাঙ্গাবিরোধী’ আইন আরও কঠোর করারও আহ্বান জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার সরকারি খাতের কর্মীরাও রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা বেতন স্থগিত রাখার প্রতিবাদ জানান। প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নগুলো নভেম্বর মাসে আরো বিক্ষোভের যৌথ কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে অচল সরকারের মেয়াদের শেষ কয়েক মাসে শরৎজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ফ্রান্সে রাস্তায় বড় ধরনের বিক্ষোভ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বাজারের আস্থা ধরে রাখতে সরকারের ব্যয় আরো কমানোর দাবি যখন জোরালো হচ্ছে, তখন স্কুলগুলোতে বিক্ষোভের ব্যাপকতা ও তীব্রতাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। ফ্রান্সের সামাজিক চুক্তি যখন ক্রমেই চাপে পড়ছে, তখন বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর শোনা জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন