সাউথ এশিয়া মনিটর এর বিশ্লেষণ

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি চায় ইউরোপের দেশগুলো, ওয়াশিংটনের কৌশল অনুসরণে অনাগ্রহী

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি চায় ইউরোপের দেশগুলো, ওয়াশিংটনের কৌশল অনুসরণে অনাগ্রহী

ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব আসলে আটলান্টিক জোটের সম্পর্কের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো প্রয়োজন মনে করে, কিন্তু ওয়াশিংটনের প্রতিটি কৌশল বা অর্থনৈতিক চাপের পদ্ধতি অনুসরণ করতে আর আগের মতো আগ্রহী নয়।

সাউথ এশিয়া মনিটরে ৩০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘দ্য চেঞ্জিং ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক রিলেশনশিপ: হোয়াই ইউরোপ ইজ রিলাকট্যান্ট টু ফলো ডোনাল্ড ট্রাম্প অন ইরান’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এর পেছনের কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন নওয়াব খান।

বিজ্ঞাপন

১. ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির অভিজ্ঞতা

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউরোপ চুক্তিটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মার্কিন সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা এবং মার্কিন বাজারে প্রবেশ—দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য হয়। ইউরোপের তৈরি ইনস্টেক্স (ইনস্ট্রুমেন্ট ইন সাপোর্ট অভ ট্রেড এক্সচেঞ্জেস)-ও শেষ পর্যন্ত কার্যকর বাণিজ্যিক চ্যানেল হয়ে উঠতে পারেনি এবং ২০২৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

২. ইউরোপের স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কিছুটা আলাদা

ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তেহরানকে মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা। বিপরীতে ইউরোপ চায়—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা।

৩. হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি নিরাপত্তা ইউরোপের জন্য বড় উদ্বেগ

ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি। ফলে ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে তেল সরবরাহ, জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি দামের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক চাপকে ইরানের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে দেখছে, সেটিই ইউরোপের ভোক্তা ও শিল্পের জন্য অর্থনৈতিক চাপ হয়ে উঠতে পারে।

৪. ইরানের সঙ্গে ইউরোপের কূটনৈতিক যোগাযোগের মূল্য

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। ফলে তেহরানের সঙ্গে ইউরোপের একটি কূটনৈতিক যোগাযোগ ও বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে, যা ওয়াশিংটনের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি। ইউরোপ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের জুনিয়র অংশীদার হয়ে সেই কূটনৈতিক সক্ষমতা নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

৫. ট্রাম্পের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে ইউরোপের সন্দেহ

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউরোপ দীর্ঘদিন চুক্তিটি রক্ষার চেষ্টা করেছিল। ফলে ইউরোপীয় সরকারগুলোর আশঙ্কা—তারা যদি এখন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে, কিন্তু পরে ওয়াশিংটন আবার আলোচনার পথে ফিরে যায়, তাহলে ইউরোপের হারানো সম্পর্ক পুনর্গঠন করা কঠিন হবে।

৬. ইউরোপ ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ চায়

নিবন্ধটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো, ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে আসছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রেখেও ইউরোপ নিজের স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে চায়। ইরান ইস্যু সেই স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

লেখকের মতে, ইউরোপ ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের বিরোধিতা করছে না; বরং চাপের মাত্রা, পদ্ধতি ও চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণে ট্রাম্প প্রশাসনের একক কর্তৃত্ব মেনে নিতে চাইছে না। ইউরোপের সামনে তিনটি স্বার্থ একসঙ্গে কাজ করছে—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়া থেকে ঠেকানো, মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ ও নতুন জ্বালানি সংকট প্রতিরোধ করা এবং নিজেদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা।

সুতরাং ইরান ইস্যু আসলে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধের গল্প নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার পুরোনো কৌশলগত সম্পর্ক কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইউরোপ এখন অনেক বেশি স্পষ্টভাবে বলতে চাইছে—লক্ষ্য এক হতে পারে, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই হতে হবে এমন নয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন