আহমেদ আসমার বিশ্লেষণ

ইসরাইলকে অনুসরণ করে ‘কাল্পনিক শত্রু’ তৈরি করছে ইউরোপ

ইসরাইলকে অনুসরণ করে ‘কাল্পনিক শত্রু’ তৈরি করছে ইউরোপ
লন্ডনে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ ও দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিতে ১০ অক্টোবর আয়োজিত ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী একজন নারী। আনাদোলু এজেন্সি

ইসরাইল ও ইউরোপের রাজনীতিতে নিরাপত্তার অজুহাতে স্থায়ী শত্রুভীতি তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। ইসরাইল যেমন নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকির কথা তুলে ধরে সামরিক অভিযান ও আঞ্চলিক নীতির পক্ষে যুক্তি দেখায়, ইউরোপের কিছু নেতাও রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা সামনে রেখে একই ধরনের রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছেন।

‘অস্তিত্বের সংকট’ বা নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকির বয়ান এখন রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এ ধরনের প্রচারণা যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দুর্বল করার সুযোগ করে দেয়।

বিজ্ঞাপন

রাশিয়ার হামলার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন

ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য আলোচনায় এসেছে। ইউরোপের কয়েকজন নেতা ন্যাটো অঞ্চলে রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করলেও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে তাৎক্ষণিক হামলা প্রস্তুতির সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ব্রাসেলসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিন্ডাউগাস সিঙ্কেভিচিয়াস রাশিয়ার আসন্ন হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা প্রমাণের প্রশ্ন তোলেন। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় লিথুয়ানিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এমন একটি দেশের নেতৃত্ব যখন তাৎক্ষণিক হামলার আশঙ্কা অতিরঞ্জিত না করার আহ্বান জানায়, তখন ইউরোপের অন্য নেতাদের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এ ছাড়া পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ন্যাটো ভূখণ্ডে রাশিয়ার ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক সতর্কবার্তার পুরোপুরি সামঞ্জস্য নেই।

ইসরাইলের ‘স্থায়ী যুদ্ধের’ বয়ান

ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকির বিষয়টি সামনে রেখে সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করে আসছে। এই বয়ান ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, দখলদারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী নীতির পক্ষে সমর্থন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসরাইলি নেতৃত্বের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা হচ্ছে। এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান ও আলোচনার সম্ভাবনা আড়ালে চলে যায়। একই সঙ্গে ইউরোপের হলোকাস্ট-পরবর্তী ঐতিহাসিক অপরাধবোধকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইল পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন আদায় করে।

এই কৌশলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—প্রতিপক্ষকে এমন একটি স্থায়ী হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা, যার সঙ্গে সমঝোতার বদলে অবিরাম সংঘাতকেই একমাত্র পথ হিসেবে দেখানো হয়।

সামরিক ব্যয় বাড়ানোর রাজনৈতিক স্বার্থ?

ইউরোপে রাশিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা-উদ্বেগের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে। সম্ভাব্য শত্রুর হুমকি যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা খাতে নতুন অর্থ বরাদ্দের পক্ষে যুক্তি দেখানো তত সহজ হয়।

অক্টোবরের শুরুতে ফ্রাঙ্কেন বেলজিয়ামের সামরিক স্থাপনার ওপর রুশ ড্রোন শনাক্ত হওয়ার কথা বলেছিলেন বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেন। পরে বেলজিয়ামের সম্প্রচারমাধ্যম ভিআরটি অনুসন্ধান করে জানায়, ওই ড্রোনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই হুমকির কথা তৈরি করা হয়েছিল।

কাল্পনিক শত্রু তৈরির বিপদ কোথায়?

নিরাপত্তার নামে স্থায়ী জরুরি পরিস্থিতি বজায় রাখার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়ে যাওয়া। যখন কোনো নীতির সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা হয়, তখন রাজনৈতিক বিতর্ক, ভিন্নমত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ইউরোপের কিছু রাজনৈতিক মহল রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত নিরসনের পরিবর্তে সামরিক প্রস্তুতি ও বৈরিতাকে দীর্ঘায়িত করতে আগ্রহী। ইসরাইলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বয়ান এবং ইউরোপের রাশিয়া বিষয়ক রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে এই জায়গাতেই মিল রয়েছে।

যদিও ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যে বাস্তব নিরাপত্তার সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে গুরুতর বিরোধ রয়েছে, সেই বাস্তব উদ্বেগকে অতিরঞ্জিত করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে তা সংঘাত আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন