ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে ভুয়া তথ্যবিরোধী সম্মেলন থেকে সরে গেল ইইউ

ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে ভুয়া তথ্যবিরোধী সম্মেলন থেকে সরে গেল ইইউ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের চাপের মুখে ইউরোপের ভুয়া তথ্য ও অপতথ্য মোকাবিলাবিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে সরে গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একই সঙ্গে কানাডা ও লিথুয়ানিয়াও সম্মেলনটির আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের জন্য সম্ভাব্য ‘তথ্য হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের হুমকি’ হিসেবে আলোচনায় রাখার বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন আপত্তি জানিয়েছিল।

লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে ৭ ও ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘#ডিসইনফো২০২৬’ সম্মেলন। ব্রাসেলসভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইইউ ডিসইনফো ল্যাব আয়োজিত এই সম্মেলনে ভুয়া তথ্য, বিদেশি তথ্য-হস্তক্ষেপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিয়ে গবেষক, সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিচ্ছেন। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলনে প্রায় ৬৫০ জন অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্মেলনের কয়েক দিন আগে এর ওয়েবসাইট থেকে লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস (ইইএএস) এবং কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার লোগো সরিয়ে ফেলা হয়। সম্মেলনের ছাপানো উপকরণেও এসব প্রতিষ্ঠানের লোগোর ওপর সাদা স্টিকার লাগিয়ে ঢেকে দেওয়ার ছবি পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, শেষ মুহূর্তে সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্মেলনটি নিয়ে যোগাযোগ করে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার বা অংশগ্রহণ কমানোর জন্য চাপ দেয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল সম্মেলনের একটি প্যানেল, যার শিরোনাম ছিল ‘ইউএসএ অ্যাজ আ এফআইএমআই থ্রেট: অ্যাকনলেজ, অ্যাডাপ্ট, পুশ ব্যাক’। এখানে এফআইএমআই বলতে বিদেশি তথ্য হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারকে বোঝানো হয়েছে।

সম্মেলনের আয়োজকদের প্রকাশিত কর্মসূচিতে বলা হয়েছিল, আলোচনায় ইউরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে একটি সম্ভাব্য তথ্য-হস্তক্ষেপের হুমকি হয়ে উঠছে—এমন একটি ‘অস্বস্তিকর প্রশ্ন’ পর্যালোচনা করা হবে। এ ছাড়া সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক কিম্বারলি প্রস্টের বক্তব্য রাখার কথা ছিল। প্রস্ট ও আরো কয়েকজন আইসিসি বিচারককে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কথিত যুদ্ধাপরাধ তদন্তের অনুমোদন দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য সম্মেলন নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে দপ্তরের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুয়া তথ্যের হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করার পর কোনো দেশ সম্মেলন থেকে দূরে সরে গেলে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ওয়াশিংটনের মতে, এ ধরনের ভাষা যৌথভাবে অপতথ্য মোকাবিলার লক্ষ্যকে দুর্বল করে এবং সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।

লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মেলনের কর্মসূচির কয়েকটি অংশ দেশটির সরকারি অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই তারা সম্মেলনে অংশগ্রহণ বাতিল করেছে। কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, কর্মসূচির কিছু অংশের ‘ফ্রেমিং’ পরিবর্তনের পর তারা কয়েকটি আলোচনায় অংশগ্রহণের ধরন পুনর্বিবেচনা করেছে। তবে কানাডার কর্মকর্তারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

ফ্রান্স এখনো সম্মেলনটির প্রধান সমর্থক হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। একজন ফরাসি কূটনীতিক বলেছেন, সরকার সম্মেলনের কর্মসূচি নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখেনি। তবে অপতথ্য মোকাবিলায় নাগরিক সমাজের উদ্যোগকে তারা নিয়মিত সমর্থন করে।

এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে তথ্যযুদ্ধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অনলাইনে বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রকে যখন ইউরোপের তথ্য-নিরাপত্তার সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে আলোচনায় আনা হচ্ছে, তখন ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সরকারি সমর্থন কমিয়ে দেওয়ার ঘটনা দুই পক্ষের সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন