ঝাড়খণ্ড সরকারের জেএসএসসি-সিজিএল ২০২৪সহ কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে একদিকে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে, অন্যদিকে চাকরি হারানোর শঙ্কায় পথে নেমেছেন পরীক্ষায় নির্বাচিত প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় নববিবাহিত এক প্রার্থী এমনও বলেছেন, স্ত্রী চাইলে তাদের সম্পর্ক শেষ করে দিতে পারেন।
সোমবার মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড সরকার জেএসএসসি-সিজিএল ২০২৪ এবং আরো কয়েকটি পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেয়। পরীক্ষাগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থা টিএসআর ডেটা প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন করছিলেন শিক্ষার্থীরা।
তবে সরকারের সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন জেএসএসসি-সিজিএল ২০২৪-এর ১ হাজার ৯৭৫ জন নির্বাচিত প্রার্থী। তাদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতের একাধিক রায়ের পর তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। এখন পরীক্ষা বাতিল হলে তাদের চাকরিও কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
রাঁচিতে ভারী বৃষ্টির মধ্যেই ঝাড়খণ্ড সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ করছিলেন চাত্রার বাসিন্দা রঘুবেন্দ্র। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই আমাকে নিয়োগপত্র দিয়েছিলেন, এখন তিনিই আমার চাকরি কেড়ে নিয়েছেন।
এর আগে গয়ার একটি স্কুলে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন রঘুবেন্দ্র। সিজিএল নিয়োগের ফল প্রকাশের পর কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও আদালতের রায়ের পর তিনি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ বাতিলের আবেদন খারিজ করার পর ৮ জানুয়ারি গয়ার শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিই। এখন আমার বয়সও সরকারি চাকরির নতুন পরীক্ষায় বসার সীমা পার হয়ে গেছে। সরকার যদি আগে পরীক্ষা বাতিল করত, তাহলে আমি এই চাকরিতে যোগই দিতাম না। এখন আমি না ঘরের, না ঘাটের।
অফিসে ঢুকতে বাধা, ভেঙে পড়েছেন নববিবাহিত প্রার্থী
কোডারমার বাসিন্দা সন্দীপ যাদব ঝাড়খণ্ডের ভিজিল্যান্স বিভাগে কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রজেক্ট ভবনে অফিস করতেন তিনি। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তের পর মঙ্গলবার তাকে অফিসে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি।
সন্দীপ জানান, নিরাপত্তাকর্মী তার পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। তিনি বলেন, গত বছর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। কারো দয়ায় চাকরি পাইনি। অথচ আজ আমাকে সেই অফিসেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। জনতার চাপের মুখে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মাত্র দুই মাস আগে বিয়ে করেছেন সন্দীপ। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় তার দাম্পত্য জীবন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বলেছি, চাকরি আছে বলে তুমি আমাকে বিয়ে করেছিলে। এখন আমার চাকরি নেই। চাইলে তুমি এই সম্পর্ক শেষ করে দিতে পারো।
আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে?
দেওঘরের বাসিন্দা ললন পাণ্ডে সহকারী সেকশন অফিসার (এএসও) পদে নির্বাচিত হয়ে জামশেদপুরে কর্মরত ছিলেন। তার পরিবারে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান—সবার ভরণপোষণের দায়িত্ব তার ওপর।
ললনের ভাষায়, নতুন কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় বসার বয়সও আমার নেই। ছোট ছোট সন্তান রয়েছে। তাদের পড়াশোনার কী হবে? আমাদের সঙ্গে চরম অন্যায় করা হচ্ছে। সরকার যদি আমাদের গুলি করেই দিত, সেটাই হয়তো ভালো হতো।
একই ক্ষোভ প্রকাশ করেন নির্বাচিত প্রার্থী গুঞ্জন সিং। তিনি আগে আসানসোল ডিভিশনে রেলের চাকরিতে ছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি থাকার জন্য ঝাড়খণ্ডের এই চাকরি বেছে নিয়েছিলেন।
গুঞ্জন বলেন, আমাদের চাকরি কেড়ে নিয়ে সরকার কার্যত আমাদের মেরেই ফেলেছে। গুলি করে দিলেই বরং ভালো হতো। আমি যেকোনো তদন্তের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। এমনকি নারকো টেস্টও দিতে রাজি।
তিনি আরো বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর আমরা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা শুনে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারিনি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরো যদি নিয়োগ বাতিল হয়, তাহলে আমরা কাকে বিশ্বাস করব?

শুরু থেকেই বিতর্কে জেএসএসসি-সিজিএল
জেএসএসসি-সিজিএল ২০২৪-এর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু থেকেই বিতর্কের মধ্যে ছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবার পরীক্ষা নেওয়ার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এরপর পরীক্ষা বাতিল করে সেপ্টেম্বরে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পরীক্ষার আগে কিছু প্রার্থীকে হাজারীবাগ, বোকারো, আসানসোল এমনকি নেপালেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ১৫০টি প্রশ্নের মধ্যে ১২০টির উত্তর মুখস্থ করানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বিষয়টি ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টে গড়ায় এবং এ নিয়ে এফআইআরও করা হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট সন্দেহভাজনদের বাদ দিয়ে বাকি নির্বাচিতদের নিয়োগপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টও পুরো নিয়োগ বাতিলের দাবি নাকচ করে দেয়। ওই রায়ের ভিত্তিতেই এখন নির্বাচিত প্রার্থীরা তাদের চাকরি বহাল রাখার দাবি জানাচ্ছেন।
নির্বাচিত প্রার্থী প্রিন্স বলেন, পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের কোনো ক্ষোভ নেই। তারা আমাদের ছোট বা বড় ভাইয়ের মতো। বিষয়টি ভাগ্য, পরিশ্রম ও সুযোগের। তারাও একদিন নির্বাচিত হতে পারতেন।
নির্বাচিত প্রার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। পাশাপাশি চাকরি রক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবছেন তারা।
সূত্র: এনডিটিভি
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


