ভারতের উত্তরপ্রদেশের লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত ঐতিহাসিক লাল বড়দারি ভবনটি সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। সেই ভবনের ভেতরেই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মাত্র মসজিদটির অবস্থান। ফলে রমজানের শুরু থেকেই সেখানে নামাজ পড়তে পারেননি সেখানকার মুসলিম শিক্ষার্থীরা। এর জেরে বিক্ষোভে নামে শিক্ষার্থীরা। ছাত্রসংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে ভবনটিতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এর প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।
সমাজবাদী ছাত্রসভা (এসসিএস), জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (এনএসইউআই) এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) রবি ও সোমবার মধ্যরাতে ভবনের বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে প্রশাসন। তাদের অভিযোগ, পবিত্র রমজান মাসে মুসলিম শিক্ষার্থীদের নামাজ পড়তে বাধা দেওয়ার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে ভবনের ভেতরে মসজিদটি সিল করে দিয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, মসজিদটির অবকাঠামো জরাজীর্ণ হওয়ায় এটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিরাপত্তা বিবেচনায় ভবনটি সিলগালা করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীরা জানান, লাল বড়দাড়ি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এবং কয়েক দশক ধরে মুসলিম শিক্ষার্থীরা এখানকার মসজিদে নামাজ আদায় করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, মসজিদের গেটটি পূর্ব নোটিস ছাড়াই ঢালাই করে সিল করে দেওয়া হয়েছিল এবং পরামর্শ ছাড়াই কাঠামোর চারপাশে বেড়া ও মেরামতের কাজ করে প্রশাসন।
বিক্ষোভ চলাকালে ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে তালাবদ্ধ ভবনের বাইরেই নামাজ আদায় করেন মুসলিম শিক্ষার্থীরা। মসজিদের বাইরে নামাজ পড়ায় পুলিশ বাধা দিতে পারে- এমন শঙ্কায় এবং শিক্ষার্থীরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ আদায় করতে পারেন, তাই তাদের চারপাশে মানব ঢাল তৈরি করে রাখেন তিনটি ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি, যাদের প্রত্যেকেই হিন্দু শিক্ষার্থী। মুসলিম সহপাঠীদের জন্য হিন্দু সহপাঠীদের ভ্রাতৃত্ববোধের এই ভিডিও স্থানীয় গণমাধ্যমের পর ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সহপাঠীদের জন্য তাদের এই কাজকে ‘গঙ্গা-যমুনা তেহজিব’ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন হিন্দু শিক্ষার্থীরা।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুসারে লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম শিক্ষার্থীরা শতাব্দীপ্রাচীন এই ভবনের ভেতরের মসজিদে নামাজ আদায় করে আসছেন। এসসিএস ছাত্রপ্রতিনিধি নবনীত কুমার বলেছেন, রমজানে মুসলিম শিক্ষার্থীরা কোথায় নামাজ পড়বেন- এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া ছাড়াই কর্তৃপক্ষ ভবনটি সিলগালা করে দেয়।
জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (এনএসইউআই) জাতীয় সমন্বয়কারী বিশাল সিং বলেন, এই পদক্ষেপ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন যে স্থানে মুসলমানরা নামাজ পড়েন, কোনো ঘোষণা ছাড়াই যদি সে জায়গাটি সিল করে দেয়, তবে তাদের অনুভূতি কেমন হবে?’ কোনো পূর্বতথ্য ছাড়াই মসজিদের দরজা ওয়েল্ডিং করে সিল করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জানা গেছে, কিছু ছাত্র ব্যারিকেড সরিয়ে ঘটনাস্থলের কাছে রাখা নির্মাণসামগ্রী বাইরে ফেলে দেয়। পরে পুলিশ এসে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে নির্মাণ সুপারিনটেনডেন্ট ড. শ্যামলেশ বলেন, ভবনটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। লাল বড়দারি ভবনটি সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত এবং যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। ভাঙা দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ভারতে মুসলিম পরিচয়ের কারণে এক নারীকে ত্রাণের কম্বল না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির সাবেক সংসদ সদস্য সুখবীর সিং জৌনপুরিয়ার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিকমাধ্যমে। ফলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, টঙ্ক-সাওয়াই মাধোপুর কেন্দ্রের সাবেক ওই সংসদ সদস্য কম্বল বিতরণ কর্মসূচিতে উপস্থিত কয়েকজন নারীর মধ্যে কম্বল বিতরণ করছিলেন। এ সময় এক নারী মুসলিম পরিচয় দিলে তাকে সরে যেতে নির্দেশ দেন ওই বিজেপি নেতা। সে সময় তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গালি দেওয়া কোনো নারীকে কম্বল দেওয়া হবে না। এ সময় তিনি আরো বলেন, এটি কোনো সরকারি অনুদান নয়, এটি তার ব্যক্তিগত অনুদান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোববার বিকালে কম্বল বিতরণ কর্মসূচিতে প্রথমে কয়েকজন নারীকে কম্বল দেওয়া হলেও পরে তাদের ধর্মীয় পরিচয় জানার পর কিছু কম্বল ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি সম্পর্কে রাজস্থান বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা টিকারাম জুলি অভিযোগ করেন, ওই বিজেপি নেতা একজন মুসলিম নারীকে অপমান করেছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

